মায়ের বন্দুকের গুলিতে বাবার মৃ/ত্যুর সাক্ষী শার্লিজ থেরন

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রত্যন্ত শহরে ১৯৭৫ সালের ৭ আগস্ট জন্ম নেওয়া শার্লিজ থেরনের শৈশব ছিল রঙিন স্বপ্ন আর কঠিন বাস্তবতার মিশেল। ছোটবেলা থেকেই শিল্পের প্রতি এক অন্যরকম টান অনুভব করেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পাঠানো হয় বোর্ডিং স্কুলে। স্বপ্ন দেখতেন পেশাদার নৃত্যশিল্পী হওয়ার।
নাচের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে থেরন পাড়ি জমান ইউরোপে। ইতালির একটি মডেলিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ধীরে ধীরে বিজ্ঞাপনের জগতে প্রবেশ করেন। এরপর মায়ের সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন শহর ঘুরে একসময় পৌঁছান নিউইয়র্কে। সেখানে স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত হাঁটুর চোটে থেমে যায় তাঁর নৃত্যজীবনের স্বপ্ন।
এই সময়ে ব্যক্তিগত জীবনেও নামে বিপর্যয়। নিউইয়র্কে জানালাবিহীন হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটে। মায়ের দেওয়া পরামর্শে ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও, এক দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে হাতে থাকা ৩০০ ডলার নিয়ে একাই পাড়ি জমান লস অ্যাঞ্জেলেসে।
সেখানকার জীবন ছিল আরও কঠিন। অর্থ সংকটে কখনো রুটি চুরি করে খেতে হয়েছে তাঁকে। এমন সময় ব্যাংকে মায়ের পাঠানো চেক ভাঙাতে গিয়ে ঘটনার মোড় নেয় নতুন দিকে। ব্যাংকে জন ক্রসবি নামের একজন গ্রাহক থেরনের প্রতিভা ও আত্মবিশ্বাস দেখে এগিয়ে আসেন। হাতে ধরিয়ে দেন নিজের বিজনেস কার্ড। তিনি মুলত তরুণ অভিনয়শিল্পীদের কাজ খুঁজে দিতেন। এভাবেই থেরনের অভিনয়জীবনের প্রথম দরজা খুলে যায়।
ক্রসবি তাঁকে একটি ফিল্ম স্কুলে ভর্তি করান। এরপরই সুযোগ আসে ১৯৯৫ সালের ‘ চিলড্রেন অফ দ্য কর্ণ ৩: আরবান হার্ভেস্ট’ নামের একটি ভৌতিক সিনেমায়। যদিও সেই সিনেমায় তাঁর কোনো সংলাপ ছিল না। কিন্তু উচ্চতা, সৌন্দর্য আর প্রতিভার সমন্বয়ে খুব অল্প সময়েই নজর কাড়েন প্রযোজকদের।
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। একের পর এক চলচ্চিত্র তাঁকে পরিণত করে হলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী অভিনেত্রীতে।
বিশেষ করে ২০০৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ মনস্টার’ সিনেমায় সিরিয়াল কিলার আইলিন উর্নোসের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০০৪ সালে অস্কারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জয় করেন। এই চরিত্রের জন্য নিজের রূপ ও গ্ল্যামারকে ভেঙে ফেলেন তিনি। যা তাঁকে অভিনয়ের দুনিয়ায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে।
হলিউডে একসময় তিনিই ছিলেন সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রীদের একজন। প্রতিটি সিনেমায় পারিশ্রমিক হতো কোটি ডলারের ঘরে। ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার এই অভিনেত্রী প্রমাণ করেছেন কেবল সৌন্দর্য নয়, প্রতিভা, পরিশ্রম আর সংকল্পই মানুষকে তৈরি করে তারকা।
তবে থেরনের জীবন শুধুই সাফল্যের গল্প নয় রয়েছে গভীর বেদনার ছায়াও। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এক ভয়াবহ ঘটনার মুখোমুখি হন তিনি। তাঁর বাবা নেশাগ্রস্থ অবস্থায় বন্দুক হাতে বাড়ি ফিরে স্ত্রী ও মেয়েকে হুমকি দেন। এমনকি গুলিও ছোড়েন তাঁদের লক্ষ্য করে। আত্মরক্ষায় থেরনের মা পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হন। যেখানে মৃত্যু হয় তাঁর বাবার। এই ঘটনা থেরনের মনে গভীর ট্রমা তৈরি করে।যা তিনি এখনো ভুলতে পারেননি।
তবু থেমে থাকেননি। নিজের যন্ত্রণা ও সংগ্রামকে পরিণত করেছেন শক্তিতে। প্রমাণ করেছেন শিকড় যতই অন্ধকারে থাকুক, ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে কেউ আলোয় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।



