Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শিশুরা কেন শুধু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়?

শিশুদের কাছে বড়দের ছুড়ে দেওয়া কিছু প্রশ্নের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি হলো, বড় হয়ে কী হতে চাও? এ প্রশ্ন সাধারণত বাচ্চার মুখ থেকে শব্দ বের হওয়ার পর থেকেই করতে থাকি আমরা, তখন শিশুটিও সুন্দর একগাল হেসে উত্তর দেয়, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই। যদিও এই ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ারের মানেও তার খুব একটা জানা নেই। তবে কেন শিশুরা শুধু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার আশাই ব্যক্ত করে?

প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে সেবার মাধ্যমিকে পা দেওয়ার পালা। বয়স কত আর হবে, নয় কী দশ। নতুন স্কুলে প্রথম দিনেই যে ভবিষ্যতে কী হতে চাই, এমন প্রশ্ন স্যার করবেন, তা আর বুঝতে বাকি ছিল না। প্রাথমিকের ফাইনাল পরীক্ষার পর আনন্দ করার বদলে মাথায় একটা টেনশন ঢুকে গেলো, নতুন শিক্ষকের সামনে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে কী বলবো? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, না শিক্ষক হতে চাই?

বেশ কয়েকদিন ভাবলাম, আমার ১৫ সদস্যের যৌথ পরিবারে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক প্রত্যেকটি পেশার মানুষই আছেন। বুঝলাম না, কাকে অনুসরণ করবো। সাহস করে বাবাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বাবা বলো তো, আমি কী হতে চাই? বাবা মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, এটা তো তুমি ঠিক করবে, তুমি কী হতে চাও। আবারও দ্বিধায় পড়ে গেলাম৷ অনেক কষ্টে সিদ্ধান্ত নিলাম, একজন শিক্ষক হবো। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনের কারণটাও বেশ মজার। স্কুলে এক শিক্ষক গর্ব করে বলছিলেন, ‘ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে কী হবে, তাদের পড়ালামই তো আমি।’ মনে হচ্ছিল এটা বেশ গৌরবের কাজ।

কিন্তু এ সিদ্ধান্তে বেশি দিন অটল থাকতে পারিনি। এদিকে নতুন স্কুলে ক্লাস শুরু হওয়ার সময় এগিয়ে এলো। আবার বাবার শরণাপন্ন হলাম। এবার প্রশ্ন, ‘বাবা, কেন শুধু পৃথিবীতে এই তিনটি পেশা?’ বাবা অবাক হয়ে বললেন, কে বললো তোমাকে পৃথিবীতে এই তিনটি পেশা! আরও অনেক পেশা রয়েছে। উৎসুক আমি এবার জানতে চাইলাম, সেসব পেশার নাম কী? বসার ঘরে আমাদের সামনে তখন টেলিভিশনে খবর চলছিল, এক ভদ্রলোক দুপুরের খবর পড়ছিলেন। বাবা হাত দিয়ে তাকে দেখিয়ে বললেন, এই যে ইনি খবর পড়ছেন, এটাও একটা পেশা। সঙ্গে আরও অনেক পেশার নাম বললেন।

বাবাকে এরপর প্রশ্ন করলাম, ‘তবে সবাই কেন শুধু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়?’ বাবা আবারও হেঁসে উত্তর দিলেন, তুমি নাহয় অন্য কিছু হওয়ার চিন্তা করো। টিভির দিকে আবার তাকালাম। আর এক রিপোর্টারকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম এর পেশা কী? বাবা বললেন, সাংবাদিকতা। সঙ্গে সঙ্গে বললাম, আমি তবে সাংবাদিক হতে চাই। বাবাও খুশি হয়ে বললেন, বেশ তোমার ইচ্ছা। এরপর নতুন স্কুলে, নতুন ক্লাসে সবাই যখন বললো, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই, আমি বললাম সাংবাদিক হতে চাই। সে নিয়ে পুরো ক্লাসজুড়ে সে কি হাসির রোল। স্যারও বিদ্রূপ করলেন। মনে মনে ভাবলাম, বোধহয় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইলেই ভালো হতো।

এই যে আমার মতো কি শিশুরা দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগে না? এত এত পেশা থাকতে শিশুরা কেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। শিশুদের সামনে এমন একটি সমাজ দাঁড় করানো হয়েছে, যেখানে সম্মানের পেশা বলতে হাতেগোনা কয়েকটি পেশার নামই বলা হয়। তার ওপর বাবা-মায়ের ইচ্ছেও চাপিয়ে দেওয়া হয় শিশুদের ওপর।

শিশু কথা বলা শিখতেই তাকে শেখানো হয়, ‘বলো বাবা,আমি ডাক্তার হতে চাই।’ আর শিশুর মস্তিষ্কেও তা এত ভালোভাবে গেঁথে যায়, সে ডাক্তার হওয়া পর্যন্ত সে বুলি আওড়াতে থাকে। আবার যারা ডাক্তার হতে না পারেন, তাদের কেউ আত্মহত্যা করেন, কেউ সারাজীবন দুঃখে দিন কাটান যে, তিনি ডাক্তার হতে পারলেন না।

এরপর বড় হয়ে তিনিও আশা করেন, তার সন্তান ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে। এই যে সুস্থ মস্তিষ্কে অসুস্থ বীজ বপন করে পুরো সমাজকে খাঁচাবন্দি করা হচ্ছে, সে জাল থেকে আর কেউ বের হতে পারছে না। বাবা-মাও সন্তানকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন দেখে যায়, সন্তানও সে ইচ্ছে পূরণের জন্য উঠেপড়ে লাগে। সন্তানকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেয় না পরিবার ও সমাজ। আর বিকশিত হওয়ার সুযোগ যে দেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়েও ভ্রূক্ষেপ নেই সমাজের বিজ্ঞজনদের। সমাজ দায়সারাভাবে ভাবছে, হোক না সবাই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার!

অনন্যা/জেএজে