Skip to content

২০শে আগস্ট, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বাধা ভেঙে এগোলেই কেন ‘নষ্ট মেয়ে’

আয়েশা সিদ্দিকা, একজন আত্মনির্ভরশীল নারী৷ পারিবারিক, সামাজিক নানান বাধা পেরিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু দিনশেষে তিনি সমাজ থেকে একটি তকমা পেয়েছেন তা হলো, ‘নির্লজ্জ’, ‘নষ্ট মেয়ে’। কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাকে যে নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তিনি তা ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছেন। আমাদের সমাজে এমন বহু আয়েশা রয়েছেন, যারা সমাজের তথাকথিত বাধা ভেরয এগোতে চাইলেই সমাজ তাদের কণ্ঠ রোধ করছে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে।

সমাজ আধুনিক থেকে আধুনিকতর হলেও আমাদের সমাজের অত্যন্ত ভুল একটি ধারণা এখনো রয়ে গেছে। আর সেই ধারণাটি হলো, ‘নারীরা শুধু সহজ কিছু কাজই করতে পারে। চ্যালেঞ্জিং কোনো পেশায় নারীরা নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে না। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি নারী কেবল সংসারই সামলায়। সংসার সামলাতেও আবার কিছু নিয়ম মানতে হবে। এই যেমন, স্বামী যা বলবে, মাথা নিচু করে শুনতে হবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাবে না। আধুনিক সমাজে প্রগতিশীল নারীরা সমাজের এসব নিয়ম একদমই মেনে নিতে চান না।

কিন্তু তখনই আসে বিপত্তি। কোনো নারী নিজেকে প্রমাণ করতে চাইলে সমাজ হাজারটা উপায় বের করে তাকে থামানোর জন্য। বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বানানো কিছু নিয়মের কথা। নারী বেশি পড়াশোনা করতে চাইলে বলা হয়, মেয়েদের আবার এত লেখাপড়া কিসের, সেই তো বিয়ে করে রান্নাই করবে। মেয়েদের শিক্ষণীয় বিষয় বলে ধরা হয়, রান্নাবান্না আর মানিয়ে নেওয়া। চাকরি করতে গেলে কয়েক ধরনের ধাক্কা সহ্য করতে হয় নারীকে, পরিবারের বাধা, সমাজের বাঁকা চাহনি, গণপরিবহনে কর্মস্থল পর্যন্ত পৌঁছাতে গিয়ে হয়রানি, অফিসের উচ্চশিক্ষিত বসের কাছে হেনস্তা আরও কত কী!

চাকরি করতে গেলে কয়েক ধরনের ধাক্কা সহ্য করতে হয় নারীকে, পরিবারের বাধা, সমাজের বাঁকা চাহনি, গণপরিবহনে কর্মস্থল পর্যন্ত পৌঁছাতে গিয়ে হয়রানি, অফিসের উচ্চশিক্ষিত বসের কাছে হেনস্তা আরও কত কী! ছবি: পিয়াল ইসরাত

এ সবকিছু ঠেলে যখন একজন নারী স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন, তখনই সমাজ তার গায়ে কাদা ছুড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কাজের খাতিরে রাত করে ঘরে ফিরলে গায়ে তকমা লাগানো হয় ‘নষ্ট-মেয়ে’। হয়রানির শিকার হয়ে প্রতিবাদ করলে বলা হয় ‘নির্লজ্জ’। কিন্তু এই সমাজেই যখন নারীর প্রতি একের পর এক অন্যায়-অবিচার হতে থাকে, তখন সমাজের মুখ যেন তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকে, অন্যদিকে বিচারের নামে চলে প্রহসন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানায়, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে গণপরিবহনে ৬৮টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৩টি ধর্ষণ, ১১টি দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ৩৪টি যৌন-হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এমন একটি খবরের পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু কমেন্ট চোখে পড়ে।

এভাবেই সমাজে নারীর বিরুদ্ধে চলমান যত অন্যায় রয়েছে, তার জন্য নারীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় বারবার। অন্যায়ে প্রতিবাদ করলে নারী হয় ‘বেহায়া’, ‘নির্লজ্জ’। আর চুপচাপ মুখ বুজে সব সহ্য করে নিলে তবে সে লক্ষ্মী মেয়ে। আর এই লক্ষ্মী মেয়ে হওয়ার চক্করে অনেক নারীই নিজেদের সঙ্গে ঘটা অন্যায় মুখ বন্ধ করে মেনে নেন।

লক্ষ্মী মেয়ে হওয়ার চক্করে অনেক নারীই নিজেদের সাথে ঘটা অন্যায় মুখ বন্ধ করে মেনে নেন। ছবি: পিয়াল ইসরাত

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদ-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গেলো বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১ হাজার ২৩৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। মোট ৩ হাজার ৭০৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া, যদি চলতি বছরের কথাই বলি। গেলো জুন মাসেই ২৯৮ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৬ জন। এর মধ্যে ৯ জন কন্যা ও ১০ জন নারীসহ ১৯ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

সরকারি -বেসরকারি পরিসংখ্যানে আসেনি বহু ঘটনা। কারণ কেউ কেউ মুখ খুললেও অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে রয়ে যাচ্ছে অন্তরালে। আর অন্তরালে থাকবে নাইবা কেন। এখনো কোনো নারী ইভটিজিং, হয়রানি কিংবা ধর্ষণের শিকার হলে তার দিকেই প্রথমে আঙুল তোলা হয়। ছুড়ে দেওয়া হয় একাধিক প্রশ্ন৷ যেমন, মেয়েটির পোশাক কেমন ছিল? একা কেন ঘর থেকে বের হয়েছিল? সন্ধ্যার পরে মেয়েদের বাইরে কী? মেয়েরা এত ঘরের বাইরে কেন যাবে? মেয়ের চরিত্র ঠিক আছে তো?

প্রতীকী ছবি: পিয়াল ইসরাত

এমন হাজারো প্রশ্নের মাঝে ঘুরপাক খাওয়ার থেকে চুপ করে সব মেনে নেওয়াকেই উত্তম মনে করেন বেশিরভাগ নারী। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ফারিয়া সুলতানা। একবার চলন্ত বাসে প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয় তা শেয়ার করেছিলেন গণমাধ্যমের সঙ্গে। তিনি বলেন, , ‘বাসে উঠলাম, ফার্মগেট থেকে উত্তরা যাবো। এখানে আলাদা কোনো ঘটনা নেই। যে হয়রানিগুলো মেয়েদের প্রায়শই সহ্য করতে হয় তেমনি একটি ঘটনা। একজন গায়ে হাত দিলো আমি প্রতিবাদ করলাম। কিন্তু আমি যার বিরুদ্ধে কথা তুললাম সে এতোটাই ভদ্র সেজে ছিলো, এরপর পুরো বাসের মানুষ আমাকে গালাগাল দিতে শুরু করলো। একপর্যায়ে এমনটা শুনতে হলো, এসব মেয়েদের জন্য সমাজের এই অবস্থা।’

তাহলে মূল কথা দাঁড়ালো যেসব নারীরা অন্যায় মুখ বুঝে সহ্য না করে প্রতিবাদ করবে তারাই সমাজ নষ্টের মূলে দায়ী। নারীর সামনে যতগুলো বাধা রয়েছে তাই তাদের জন্য সীমাবদ্ধতা। সেই বাধা ভেঙে এগোলেই তিনি হবেন ‘নির্লজ্জ’ আর সমাজের তথাকথিত সব অপকর্মের দায় এসে পড়বে তার ঘাড়েই৷

কোনো নারী চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করতে চাইলে তার দিকে নোংরা মন্তব্য না ছুঁড়ে উৎসাহ প্রদানের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। ছবি: পিয়াল ইসরাত

সমাজকে এগিয়ে নিতে নারী-পুরুষ উভয়ের ভূমিকাই জরুরি। আর সমাজের উন্নয়নে নারী তখনই ভূমিকা রাখতে পারবে যখন তাকে স্বাধীনতা দেওয়া হবে। যদিও আমাদের সমাজে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা যে ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে, তা এত সহজে ওপরে ফেলা সম্ভব নয়। এ দায়িত্ব নিতে হবে ব্যক্তি-পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপর্যায়ে।

কোনো নারী চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করতে চাইলে তার দিকে নোংরা মন্তব্য না ছুড়ে উৎসাহ দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। নারী শিক্ষায় জোর দিতে হবে, নারীকে যেকোনো ধরনের কাজই হোক সুযোগ দিতে হবে, আইনের ব্যবহার যথোপযুক্ত করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, ব্যক্তিপর্যায়ের সম্মিলিত প্রয়াসেই সম্ভব নারীর প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায় ও বৈষম্য দূর করা।

অনন্যা/জেএজে