Skip to content

২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | সোমবার | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

প্রতিমা দেবী

যুগে যুগে অনেক নারীর অনেক সংগ্রামের কথা উঠে এসেছে। এমনই এক নারী প্রতিমা দেবী। প্রতিমা দেবী সেই সব নারীদের একজন, যাঁরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহচর্য ও সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। 

 

প্রতিমা দেবী সম্পর্কের দিক থেকে এক দিকে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পৌত্রী, আবার অন্য দিকে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের স্ত্রী। জোড়াসাঁকোর ৫ ও ৬ নম্বর বাড়ি মিলিয়ে যে ঠাকুর-পরিবার, সেই ৫ নম্বর জোড়াসাঁকোর মেয়ে প্রতিমা দেবী। বিংশ শতাব্দীর এক বিশিষ্ট ও খ্যাতকীর্তি নারী ছিলেন তিনি।

 

প্রতিমা দেবীর প্রথম জীবন ছিল কষ্টময়। ৬ নম্বর ঠাকুরবাড়ির লোকেরা ব্রাহ্ম ছিলেন। তাই সে বাড়িতে মেয়েরা স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করার সুযোগ পেতেন। কিন্তু ৫ নম্বর বাড়ির মেয়েদের বিয়ের আগ অব্দি অন্দরেই বসবাস করতে হতো। সনাতন ধর্মাবলম্বী ও আশ্রিতদের বাড়িতে পড়াশোনা করার সুযোগ তেমন ছিল না। এখানে মেয়েদের ছোট থেকে ঘরের কাজ শেখানো হতো। প্রতিমা দেবীকেও মাত্র ১০ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নে নীলানাথের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়।

 

১৯০৩ সালে বিয়ের দুই মাসের মাথায় নীলানাথ যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের বাগানবাড়ি সুরধুনীতে বেড়াতে গিয়ে গঙ্গায় সাঁতার শিখতে গিয়ে জলে ডুবে মারা যান। এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন প্রতিমা দেবী স্বয়ং। এরপর তাঁর জীবন হলো বেদনাময়। তাঁর দিন কাটতে লাগল পিতৃগৃহে। কারণ, ১০ বছর বয়সী মেয়েটির জায়গা হয়নি শ্বশুর বাড়িতে, বরং সেখান থেকে অপয়ার তকমা নিয়ে ফিরতে হয় বাবার বাড়িতে।

 

৪-৫ বছর বয়সে থাকাকালেই প্রতিমা দেবীকে নিজের পুত্রবধূ করতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী। কিন্তু বয়স কম হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ এই বিয়েতে মত দেননি। কিন্তু রথীন্দ্রনাথ বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফিরলে রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবীর বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এটিই ছিল ঠাকুর বাড়ির প্রথম বিধবা-বিবাহ। 

 

প্রতিমা দেবী কর্মজীবনে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর স্বামীর সাথে নিজেকে বিশ্বভারতী ও শান্তিনিকেতনের নানা কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। নানা রকম কারুশিল্প প্রবর্তন ও রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য পরিকল্পনায় সহযোগিতাও করতেন তিনি। চিত্রশিল্পীও ছিলেন, ইতালীয় শিক্ষক গিলহার্ডির কাছে কিছু দিন ছবি আঁকা শিখেছিলেন। বাঙালিদের সে-সময় নাচ শেখার তেমন প্রচলন ছিল না। রবীন্দ্রনাথের 'বাল্মিকীপ্রতিভা' এবং 'মায়ার খেলা'য় নাচের অংশ ছিল। তিনি নিজে মঞ্চে খুব কম উপস্থিত হতেন। নিজে অভিনয় না করলেও রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যের প্রধান উৎসাহী ছিলেন তিনিই। 

 

শান্তিনিকেতনের নৃত্য প্রতিমা দেবীর নির্দেশনায় কোনো বিশেষ প্রকারের নৃত্যশৈলীর আঙ্গিককে গ্রহণ করেনি। তিনি মিশ্র তাল ও ভঙ্গির সংমিশ্রণে বৈচিত্র্য এনেছিলেন এবং সেই সাথে সার্থকভাবে সঙ্গীতের ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন।

 

সাহিত্যচর্চায়ও প্রতিমা দেবী নিজেকে জড়িয়েছিলেন। কল্পিতা দেবী ছদ্মনামে প্রবাসী পত্রিকাতে কবিতা লিখেছিলেন। তাঁর এই ছদ্মনামটি ঠিক করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। কখনো কবিতাগুলো সংশোধনও করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। 

 

শান্তিনিকেতনে নারী-শিক্ষা ও নারী-কল্যাণের দিকেও নজর রাখতেন প্রতিমা দেবী। মেয়েদের নিয়ে আলাপনী সমিতিও গঠন করেছিলেন তিনি। এই সমিতিতে গান ও অভিনয় হতো। আশ্রম থেকে মেয়েরা গ্রামে গিয়ে গ্রামের অশিক্ষিত মেয়েদের স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি, শরীরের যত্ন, হাতের কাজ প্রভৃতি শেখাতো তাঁর ব্যবস্থাপনায়।

 

একইসাথে কবি, লেখিকা, চিত্রশিল্পী ও নৃত্যবিশ্বারদ মহীয়সী নারী ১৯৬৯ সালের ৯ জানুয়ারী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।