Skip to content

২১শে মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বন্ধ হোক নারীনির্যাতন

সভ্য জাতির পরিচয়, মানুষ হিসেবে নারীকে মূল্যায়ন করা। নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসেও নারীরা প্রতিনিয়তই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে । কখনো ঘরে আবার কখনো বা বাইরে। সর্বত্রই নারীর জন্য হায়েনারা ওঁৎপেতে বসে আছে। জীবনযাপনের স্বাভাবিক পরিবেশটুকুও নারীর জন্য আজও নিশ্চিত করা যায়নি। নারী মানেই যেন অস্পৃশ্য কোনোকিছু। নারীর প্রতি আামদের পরিবার ও সমাজের মানসিকতা কবে বদলাবে? সামগ্রিকভাবে নারী নির্যাতন কবে বন্ধ হবে? নারীর প্রতি এমন আচরণ সমাজ-সংসারের জন্য বিরূপ পরিবেশ তৈরি করে। শুধু তাই নয় বরং মানব জাতির ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কিত হতে হয়! যদি নারী নির্যাতন বন্ধ না করা যায়, তবে ভবিষ্যৎ জাতিকেই এর ভয়াবহ ফল ভোগ করতে হবে।

গত ১ জানুযারি একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এই রিপোর্টে নারী নির্যাতনের যে ভয়াবহ চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে তা দেখে আঁতকে উঠতে হয়। আমরা সভ্য সমাজের তকমাধারী মানুষ কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমাদের কদর্যতা কতটা গভীর তাই স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ হয়ে মানুষের প্রতি এত নিষ্ঠুর আচরণ কিভাবে একজন মানুষকে সত্যিই মানুষ বলে গণ্য করা যায়! রোববার (১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এই ভয়াবহ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। তাদের দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২২ সালে এক হাজার ৮৭৬ জন নারী এবং এক হাজার ৬১৯ জন কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।এতে বলা হয়, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদে সংরক্ষিত ১৩টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট তিন হাজার ৪৯৫ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬৭২ জন কন্যা ও ৩১৫ জন নারী। এদের মধ্যে ১২১ জন কন্যাসহ ২২৬ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, ২৩ জন কন্যাসহ ৩৮ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ৭ জন কন্যাসহ ৮ জন ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়াও ৯৪ জন কন্যাসহ ১৪০ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

এছাড়া যৌন নিপীড়নের শিকার ১৬৩ জনের মধ্যে ১২২ জনই কন্যা। উত্ত্যক্তকরণের শিকার ১২৫ জনের মধ্যে ১০৪ জন কন্যা। উত্ত্যক্তকরণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ছয় কন্যাসহ সাতজন।

নারী ও কন্যা পাচারের ১০৮টি ঘটনার শিকার ২৮ জন কন্যা। এসিডদগ্ধের শিকার ২২ জনের মধ্যে কন্যা তিনজন। ২৫টি অগ্নিদগ্ধের ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং যার মধ্যে তিনজন কন্যা। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার ১৬৫ জনের মধ্যে ৬৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এই ৬৫ জনের মধ্যে তিনজন কন্যা। শারীরিক নির্যাতনের শিকার ২১৯ জনের মধ্যে ৫১ জন কন্যা।

পারিবারিক সহিংসতায় শারীরিক নির্যাতনের শিকার ২১ জনের মধ্যে পাঁচজন কন্যা। প্রতিকার রিপোর্ট অনুযায়ী বছরে সারাদেশে মানসিক নির্যাতনের শিকার ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন একজন। আবার ১৩ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় পাঁচজন গৃহকর্মী হত্যার ঘটনা ঘটেছে এবং দুইজন আত্মহত্যা করেছেন। বিভিন্ন কারণে ৯২ জন কন্যাসহ ৫০৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন কারণে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ৫২ জনকে যার মধ্যে কন্যা ১২ জন।

রাষ্ট্রকেও নারীর প্রতি সহনশীল মনোভাব নিয়ে পাশে দাঁড়াতে হবে। ঘুকে যাক জরা- মনের যত কলুষতা। নারী পাক নির্মল পৃথিবী।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রিপোর্ট অনুযায়ী, ৬৯ জন কন্যাসহ ৩১০ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। ৮২ জন কন্যাসহ ২৩৯ জনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৬ জন কন্যাসহ ৩৭ জন আত্মহত্যার প্ররোচনার শিকার হয়েছেন। এছাড়াও আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা কন্যাসহ পাঁচটি। এবং পিতৃত্বের দাবির ঘটনা একটি।

১০৯ জন কন্যাসহ ১২৭ জন অপহরণ এবং ছয়জন কন্যাসহ সাতজন অপহরণ চেষ্টার শিকার হয়েছেন। একজন কন্যাসহ নয়জন ফতোয়ার শিকার হয়েছেন। দুইজনকে পতিতালয়ে বিক্রি করা হয়েছে। জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা ঘটেছে দুইটি। পুলিশের নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে পাঁচটি। ২৯ জন কন্যাসহ ৫৭ জন সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছেন।

বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে ২৭টি। বাল্যবিবাহের ঘটনা প্রতিরোধ করা হয়েছে ৬১টি। এছাড়া ৩১ জন কন্যাসহ ৯৪ জন বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ঘটনার ধরন ভিন্ন হলেও আজকের যুগে এসেও নারীরা এত প্রবলভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নারীর সঙ্গে ঘটে চলা যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, ইভটিজিং, ধর্ষণের পর হত্যা করে গুম, খুন যেন খুবই স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে পড়েছে আজকাল। নারীর সঙ্গে এত বিভৎস আচরণ আমাদের মানসিকতার প্রশ্ন তোলে।

নারীরা প্রতিনিয়তই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ভিন্ন ভিন্নভাবে। কিন্তু সঠিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীকে কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বরং পাওয়ার, পজিশন, প্রতিপত্তি, টাকার জোরে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। আর এর ফলে নারীকে এতটা অবমূল্যায়ন এবং সস্তা ভাবতে বসেছে যে এক শ্রেণি নারীর ওপর বারংবার নির্যাতন করেই চলেছে। নারীকে ভোগ্যপণ্য, অসহায়, অবলা ভেবে নারীর প্রতি সহিংস নির্যাতন করছে।

নারীকে স্বাভাবিক সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে দিলে এই দেশ- জাতি একটি সুন্দর পৃথিবী পাবে। মূলত মানুষ হয়ে মানুষের প্রতি যদি সহিংস হয়ে ওঠা যায় তাহলে একদিন মানব জাতির মধ্যেই এর জন্য একটা বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। কারণ জীবন একটি ঘূর্ণন প্রকিয়ার মাধ্যমেই যাপিত হয়। নারীরা যখন প্রতিনিয়তই দেখবে তাদের প্রতি সহিংসতা বেড়েই যাচ্ছে, এ সমাজ তাকে কিছু দেওয়ার চেয়ে বরং তার মনকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলছে তখন স্বাভাবিকভাবেই নারী জাতি তার স্থান থেকে সরে যাবে। ফলে জীববৈচিত্র্যের যে, সৌন্দর্য-পারস্পরিক ভালোবাসা-সম্প্রীতির ঘাটতি দেখা দেবে। সমাজে, বর্তমান সময়ে পরিবারগুলোর দিকে লক্ষ করলে এর অনেকটা প্রমাণ স্পষ্ট হয়ে উঠবে। অর্থাৎ নারীকে মূল্যায়ন করা, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার দ্বারা জীবনকে সহজ করে তোলা আমদের জাতিসত্তাকে টিকিয়ে রাখারও মাধ্যম বটে। সাংসারিক জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে, নারীরা আজও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে ফলে আধুনিক মানুষ বা বর্তমান সময়ে অনেকেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে ভয় পায়। এর দীর্ঘমেয়াদি ফল আরও ভয়াবহ!

শুধু পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপনেই নয় নারী-পুরুষ যদি একে অপরের প্রতি নমনীয় না হয় তবে আমাদের সমাজ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে বাধ্য। ফলে মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। নারী নির্যাতন রুখতে হলে, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। নারীকে পণ্য ভাবা বন্ধ করতে হবে। নারীর যোগ্য মান-মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নারীরা আপন ভুবনে জেগে উঠবে কিন্তু সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পুরো মানব জাতিকেই। এছাড়া আইনের আওতায় এনে অভিযুক্তের উপর্যুপরি তথ্য-প্রমাণ নিশ্চিত করে কঠোর শাস্তি বিধান করতে হবে। আমরা জানি, আইনের চোখে সবাই সমান। ফলে নির্যাতনের শিকার হলে আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এবং রাষ্ট্রকেও নারীর প্রতি সহনশীল মনোভাব নিয়ে পাশে দাঁড়াতে হবে। ঘুকে যাক জরা- মনের যত কলুষতা। নারী পাক নির্মল পৃথিবী।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ