Skip to content

২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বিয়ে কি নারীকে সুখের নিশ্চয়তা দেয়?

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ মাত্রই সামাজিক জীব। আর সামাজিক জীব বলে তারা যৌথভাবে বসবাস করতেই স্বস্তিবোধ করে। যৌথভাবে বসবাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হলো পরিবার। আর এই পরিবার গঠনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হলো বিয়ে। কিন্তু এই বিয়ের মাধ্যমে পুরুষরা যতটা নারীর ওপর কর্তৃত্ব করে সুখী হতে চায়, নারীরা ততটা পারে না। পেশাজীবী নারীরা বলছেন, বিয়ে সবসময় নারীকে সুখের নিশ্চয়তা না-ও দিতে পারে। নারী সুখী হতে চাইলে তাকে স্বাবলম্বী হতে হবে। পরনির্ভরশীলতা পরিহার করতে হবে। না হলে বিয়ের পর স্বামীর ওপর নির্ভর করলে নারী সুখী হতে পারবে না।

কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী কিযী তাহ্‌নিন বলেন, ‘আমার মতে পারে না। লক্ষ্য যদি হয় শুধু সুখ, তবে বিয়ে কিংবা একা থাকা কোনোটাই আনন্দদায়ক হয় না। বিয়েটাকে যদি সমাজ আরোপিত সব চেকলিস্ট মেলানোর একটি মাধ্যম ভাবা হয়, নিজেকে শুধু আর্থিকভাবে সচল করার একটি উপায় হয়, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি আশ্রয় মনে করা হয়, তবে বিয়ে সুখের কিছু নয়। এটি স্রেফ ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশ এবং ক্ষমতাতন্ত্রের এক আদি কৌশল মাত্র।’ তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সৃজনশীল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার যাত্রায় বিয়েকে যদি যুক্ত করা হয়, যেখানে প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে, এবং বিশ্বাস আছে, তবে একজন মানুষ সুখী হয়। সুখ একটি আপেক্ষিক বিষয়। একজন সাবলম্বী মানুষ সুখবোধ করতে পারেন, সেখানে সুস্থ বৈবাহিক সম্পর্কের ভূমিকা অবশ্যই থাকে। কিন্তু শুধু বিয়ে সুখের একমাত্র উপকরণ নয়।’

কীযি তাহনিন

লেখক ও শিক্ষক রুশা চৌধুরী বলেন, ‘‘সুখ আসলে কী? ‘তারে ধরি ধরি মনে করি/ ধরতে গেলে আর পেলাম না’, এই বাক্যটির মাঝেই সুখের সংজ্ঞা লুকানো আছে মনে হয়। এই সোনার কাঠির সঙ্গে যখন বিয়ে নামের দিল্লি কা লাড্ডু মেলে, তখন জগতের কোথায় যেন খানিক তোলপাড় ঘটে। ‘সুখ নেই কো মনে/ নাকছাবিটি হারিয়ে গেছে হলুদ বনের ধারে’; এদেশের তাবৎ বিবাহিত নারী একবার হলেও মনে মনে এ কথা না বলে যায় না! যে সুখের বা স্বস্তির আশায় এই বিশেষ পিঁড়িটিতে বসা, তা আসলে কোনো চাওয়া পাওয়ার কাঙ্ক্ষিত কিনারাতেই নিতে পারবে না নারীকে; যদি না সে নিজে তা খুঁজে পায়। এই খুঁজে পাওয়া বা খুঁজতে চাওয়ার মাঝেই এ জীবনের অনন্ত সুখের চাবিকাঠি। তবে কেন বিয়ের নাম আসে?’’ তিনি আরও বলেন, ‘আসলে এই সমাজে বিয়ে প্রতিটা মেয়ের জীবনেই তার একদম সোনালি সময়ে এসে হাজির হয় যে, তাকে এড়ানোর সাধ্য কার?’

রুশা চৌধুরী আরও বলেন, ‘‘কর্মজীবী হোক বা না হোক; সারাদিনের চাল-ডাল নুনের খবর নেওয়া, শ্বশুর-শাশুড়ি-স্বামী-সন্তান সামলে সংসারটা গুছিয়ে বিয়ের রঙিন ঘরে সুখ হয় নিজেই লেপ্টে থাকে অথবা কোন পথে প্রবেশ করবে ভেবে পায় না। তাই তো ভর-ভরন্ত সুখী চেহারার নারীটিও একলা দুপুরে নিজেকে হারায় কোনো পদ্মবিলের কোনে বা গভীর রাতে বারান্দার কোনে তার দীর্ঘশ্বাস জমা হয়। নারীর সুখের আসল ঠিকানা ‘বিয়ে’ নামক একটি কাগুজে ব্যাপারের সঙ্গে জড়ানো নিতান্তই ছেলেভুলানো হয়ে যায়।’’

রুশা চৌধুরী

শিক্ষক ও উদ্যোক্তা ফেরদৌস জ্যোতি বলেন, ‘সুখ-দুঃখ মানুষের জীবনে আছে, থাকবেই। তবে শব্দ দুটোর অর্থ আলাদা। সুখকেই মানুষ তার জীবনে সবচেয়ে বেশি আশা করে। একজন মেয়ের জীবনজুড়ে থাকে তার নিজের পরিবার। ঠিক তেমন আর একটা পরিবার হয়; বিশেষ করে জীবনসঙ্গীর পরিবার। বিয়ে দুটি মানুষের মনের ব্যাপার, আত্মার ব্যাপার হলেও পারস্পরিক সম্পর্কে শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা, দুজন দুজনকে বোঝার মধ্যে সম্পর্কের সুস্থ পরিণতি পায়। একজন নারীর কাছে বিয়ে মানেই খুব সুন্দর স্বপ্ন। কিন্তু বিয়ে নারীর সুখের নিশ্চয়তা সব সময় দিতে পারে না।’

জ্যোতি আরও বলেন, ‘একজন নারী নিজে সিঙ্গেল থেকে সাবলম্বী হয়ে সুখী হতে পারে। আবার নিজের পরিবারকে নিয়ে সুখী থাকতে পারে। ছোট্ট একটা গবেষণা করলে সহজেই অনুমান করা যায় আসলে নারীদের পরিস্থিতি। অনেক নারী উচ্চশিক্ষিত হয়েও আজ অসুখী। কারণ হলো বিয়ের পর পারিবারিক নির্যাতন, সামাজিক বুলিং, যৌতুক, কিংবা আত্মীয়-স্বজনের কটু কথা। বিয়ে হচ্ছে সামাজিক বন্ধন। তবে এই বন্ধনই যদি গলার কাঁটা হয়, তা কখনোই সুখ আনতে পারে না। সুখ একান্ত ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার। ফলে বিয়ের মাধ্যমেই নারীর জীবনে সুখ আসবে একথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সুখের সাক্ষাৎ পেতে হলে অবশ্যই নারীকে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। নিজেকে প্রাধান্য দিতে হবে। সর্বোপরি জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব না কষে জীবনকে পরিপূর্ণ উপভোগ করতে হবে।’

ফেরদৌস জ্যোতি

এই উদ্যোক্তা আরও বলেন, ‘বিয়ে, স্বামী, সংসারই যে নারীর সুখের কারণ; এই ধারণা আমাদের সমাজে বেড়ে উঠেছে। বিশেষত পরিবারগুলো নারীদের এভাবেই গড়ে তোলে। কিন্তু বিয়ের মাধ্যমে শান্তি ও অশান্তি দুই হতে পারে। কেউ হলফ করে বিয়েকেই সুখের মাধ্যম বলতে পারে না। মূলত সুখ বিষয়টাই তো আপেক্ষিক। সেখানে বিশেষ ক্যাটাগরি করে বিয়েকে সুখের মাধ্যম বলা ভুল। তবে সুখের জন্য অবশ্যই প্রধান সহায়ক হচ্ছে মেয়েদের আর্থনৈতিক সচ্ছলতা। একজন মেয়ে যত স্বাবলম্বী হবে, সে ঠিক ততটাই পরিবেশ -পরিস্থিতিকে নিজের মতো করে সামাল দেওয়ার অসম্ভব ক্ষমতা বা শক্তি সঞ্চয় করেন।’

ফেরদৌস জ্যোতি বলেন, ‘যখন নারীর মধ্যে এই অদম্য শক্তিটি চলে আসে তখন নারীর মনে এমনিতেই প্রফুল্লতা কাজ করে। তিনি একটি অদৃশ্য শক্তির জোর মনে অনুভব করেন। যেই শক্তি তাকে সুখী করে তুলতে অনেকটা সহায়ক। তাই বিয়ে নামক সুখ যা সামাজিক ও মানসিকভাবে গড়ে ওঠা ভিত্তহীন বিষয় তার সঙ্গে সুখের কোনো সংযোগ নেই। সুখী হতে হলে ব্যক্তিকেই তার পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে সুখে থাকার আশা করা আকাশ-কুসুম কল্পনার সামিল।’