Skip to content

১লা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কিশোরী মায়ের মৃত্যুঝুঁকি: সচেতন হওয়া জরুরি

জান্নাতুল-যূথী

বাল্যবিয়ের ফলে প্রতি বছর অসংখ্য কিশোরী স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। পরিবারের অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অপব্যাখ্যা, সামাজের প্রচলিত রীতি-নীতি, কন্যাদের প্রতি অবহেলা, অযত্ন-অসম্মান, আস্থা-বিশ্বাসের ঘাটতি প্রভৃতি কারণে স্কুলের গণ্ডি না পেরুতেই অনেক বাবা-মা মেয়েকে পাত্রস্থ করছেন। অপ্রাপ্ত বয়সে তাদের বিয়ে দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।

করোনা মহামারি তৎ-পরবর্তীকালে বাল্যবিয়ের প্রবণতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এও দেখা গেছে যে ১০-১৯ বছর বয়সী এসব মেয়েরা শুধু বিবাহিতই না অনেক কিশোরী এখন মা। অল্পবয়সে বিয়ে দিয়ে কাঁধে তুলে দেওয়া হচ্ছে দায়িত্বের বোঝা সেইসঙ্গে কোলের সন্তান নিয়ে না বুঝে ওঠার আগেই এই মেয়েরা তাদের জীবন হুমকির সম্মুখীন করে তুলছে। যাদের কৈশোরকালটা খেলাধুলা, হাসি-তামাশা-জ্ঞান অর্জনের পেছনে ব্যয় করা দরকার, তারা সংসারের কষাঘাতে আঁটকে পড়ছে। এই কিশোরী মায়েরা নিজেদের জীবনে যেমন সর্বনাশ ডেকে আনছে তেমনই সন্তানকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিশোরী মায়েদের মৃত্যুঝুঁকি কমাতে এখনই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

চলতি বছরের এসএসসি; এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রেও বেশ কয়েকজন কিশোরীকে সন্তান কোলে পরীক্ষার হলে উপস্থিত হতে দেখা গেছে। এটি খুবই মর্মান্তিক একটি চিত্র। তারচেয়ে আরও ভয়াবহ হলো বেশিরভাগ কিশোরী বিয়ের পর পাড়াশোনা থেকেই হারিয়ে যায়। স্বামী বা তার পরিবারের সদস্যরা এমনকি মেয়ের পরিবারের সদস্যরাও আর মেয়েকে পড়াশোনা করাতে চান না। আর পরিবার, সমাজের সবার মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে গিয়ে কিশোরী মেয়েটি জীবনকে মৃত্যুমুখী করে তোলে।

বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও ১০-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের গর্ভধারণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সন্তান জনন্মদানের সময় এসব কিশোরী প্রসূতির মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে মায়েদের আজীবন স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অপুষ্ট শিশুর জন্মদানের আশঙ্কাও রয়েছে। অশিক্ষা, অর্থনৈতিক সংকট, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত ও অপ্রাপ্তির কারণেই বাড়ছে কিশোরীদের গর্ভধারণ। ১৮ বছরের আগে বিয়ে হলে কিশোরীরা অপুষ্টিতে ভোগে৷ এই অপুষ্টি যেমন মায়ের তেমনই সন্তানকেও দুর্বল করে তোলে। এতে করে ২০ বছর বয়সের আগে সন্তান জন্ম দেওয়া মায়েদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।

ইউনিসেফের মতে, বাংলাদেশে বয়ঃসন্ধিকালেই অনেক মেয়ে গর্ভধারণ, সহিংসতা ও অপুষ্টির ঝুঁকিতে থাকে। এ বয়সের মেয়েদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক ও সামাজিক বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। আর একারণে অনেক নবজাতকের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে সন্তান প্রসবের পর মা ও শিশু রোগাক্রান্ত হন। বাংলাদেশে বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরীদের প্রতি ৩ জনের মধ্যে ১ জন রুগ্ন। জিংক, আয়োডিন ও আয়রনের জাতীয় পুষ্টির ঘাটতি থাকায় শতকরা ১১ জন কিশোরী স্বস্থ্যগতভাবে দুর্বল বা রোগাক্রান্ত।

পারিবারিক এবং সামাজিক চাপের কারণে ১৫ – ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের গর্ভধারণের ফলে তাদের শারীরিক, মানসিক স্বস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এসব কিশোরীরা ধীরে ধীরে নানরকম শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে দ্রুত। ২০ বছরের আগে কিশোরীদের শারীরিক গঠন সন্তান জন্মদানের উপযুক্ত থাকে না। এজন্য রক্তস্বল্পতা, প্রসবপূর্ব খিঁচুনি, বাধাগ্রস্ত প্রসব, প্রসবের সময় আঘাতে প্রজনন অঙ্গ ক্ষতবিক্ষত হয়। এর ফলে সন্তানের ওজনও কম হয়। শারীরিকভাবে দুর্বল হতে পারে। বর্তমানে বেশিরভাগ প্রসূতি মায়ের সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে সিজার করা হচ্ছে। যা কিশোরীদের শরীরকে পঙ্গু করে দিচ্ছে চিরতরে। কোমরে, পিঠে ব্যথা, ঘন ঘন শরীরের নানারকম জটিলতাও দেখা দেয়। এ অবস্থা বিবেচনা করে যদি পরিবারের সহানুভূতি, ভালোবাসা না থাকে তবে এই ভয়াবহ অবস্থার পরিত্রাণ ঘটানো কঠিন।

পরিবার, সমাজকে কিশোরীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে। তাই বলে একজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোরীকে বিয়ে দিয়ে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে না। এ বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের সচেতন হতে হবে। ইচ্ছে শক্তির অভাব ছাড়া কিছুই নয় বলা চলে। সব সদস্যদের কষ্টে-সৃষ্টে যদি পালন করার সামর্থ্য থাকে তবে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, ধর্মের দোহায় দিয়ে কিশোরীকে পঙ্গু করতে পারে না পরিবারের সদস্যরা। বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে।

সন্তানের মৃত্যু কামনা করা কোন পিতা-মাতার কাম্য নয়। বাল্যবিবাহ দেওয়ার অর্থই কিশোরীর মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়া। তাই সর্বপ্রথম পরিবারগুলোকে সচেতন হতে হবে। সমাজ বদলাবে যদি আমরা নিজেরা বদলায় কারণ মানুষকে নিয়েই সমাজ। ফলে নিজে বদলান। আপনার ছোট্ট কন্যা সন্তানকে সুশিক্ষিত করে তুলুন, নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখান, স্বাবলম্বী হোক প্রতিটি নারী এই হোক আত্মপ্রত্যয়।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ