Skip to content

২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পুরুষতন্ত্রের বিদ্রূপ ক্ষমতাসীন নারীকেও ছাড়ে না

জান্নাতুল-যূথী

নারী দরিদ্র হলে দোষ, ধনী হলেও দোষ। ক্ষমতাহীন হলেও দোষ, ক্ষমতাসীন হলেও দোষ। কোন জগতের বাসিন্দা আমরা? ভাবতে খুব অবাক লাগে! একটা স্মার্টফোন সবার হাতে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে বলেই কি তার নেতিবাচক ব্যবহার করতে হবে? বিকৃত মন্তব্য ছুড়ে দিতে হবে অন্যের প্রতি? ভাবনার এতটুকু অবকাশ না দিয়েই দেখামাত্রই আগে ট্রেনের সিট বুকিং করার মতো বুঝে না বুঝে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য দিয়ে ভরিয়ে তুলতে হয় নিউজফিড, সোশাল মিডিয়ার বিভিন্ন মাধ্যম।

বিষয়টা নারীদের ক্ষেত্রে খুবই অপ্রীতিকর পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেও মন্তব্য করা চায় একশ্রেণির বাজে মানসিকতার মানুষের। মন্তব্য যে শুধু বিত্তহীন নারীর প্রতি বা ক্ষমতাহীন নারীর প্রতি এমনটা নয় বরং দক্ষতা, যোগ্যতাসম্পন্ন নারীকেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমের বরাতে একটি সংবাদ বিশেষভাবে বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। নাচ- গানের ভিডিও প্রকাশের পর ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সানা মারিন তোপের মুখে পড়েছেন। নেট পাড়ায় দেশটির নাগরিক থেকে শুরু করে বহিঃবিশ্বেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। কিন্তু কেন?

নারীর পাশে নারীর সমর্থন হিসেবে যুক্ত হয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে পোস্ট দিয়েছেন নিজের নাচের একটি ছবিও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের ফলে বেশিরভাগ ব্যবহারকারী ভুলতে বসেছেন ব্যক্তির স্বাধীনতা সম্পর্কে। মানুষ হিসেবে মানুষকে মূল্যায়ন করতে। ফলে পদ-পদবি, লিঙ্গভেদে সবই যেন এখন হিসাবের খাতায় নগদেই সুরাহা হচ্ছে। রায় দিচ্ছেন কিছু না বুঝেই। মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যে কারও নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না, এ ব্যাপরে সবাই যেন উদাস। নিজের মন্তব্য করা গেলেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে এই দলের অন্তর্ভুক্তরা। তিনি সাধারণ নারী হন বা প্রধানমন্ত্রী। তাতে এ শ্রেণির কিছুই এসে যায় না। কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রী বলে কি তার ব্যক্তিগত জীবন থাকতে নেই?

পাশের মানুষটির সঙ্গে কথা বলার সময় না থাক কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কে কতটা সচল, কার পরিবার কেমন, কে কী পরিধান করছে, কে কার সঙ্গে বেড়াচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কী বলছেন, কী করছেন; সবটাই নখদর্পণে থাকছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী সানা মারিনকে তার বন্ধুদের সঙ্গে একটি পার্টিতে নাচতে ও গাইতে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। অনেকে বলছেন একজন প্রধানমন্ত্রীর এমন আচরণ হতে পারে না। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকে আবার সানা মারিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা বলেছেন, ৩৬ বছর বয়সী এ প্রধানমন্ত্রীর অধিকার আছে তার বন্ধুদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পার্টিতে অংশগ্রহণের। তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। গতকাল রোববার (২৮ আগস্ট) ওই টুইটার পোস্টে সানা মারিনকে ট্যাগ করে হিলারি লিখেছেন, ‘নাচতে থাকুন’। নিজের একটি ছবিও তিনি পোস্ট করেছেন। জনাকীর্ণ ক্লাবের ভেতরে মুখভরা হাসি নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নাচতে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টা যদি প্রধানমন্ত্রী না হয়ে সাধারণ নারী হতেন, সেখানেও কি এই মন্তব্যকারীদের মুখ বন্ধ রাখা যেতো? ব্যক্তিগত জীবন ব্যক্তির নিজ ইচ্ছে-স্বাচ্ছন্দ্যে যাপন করেন। কিন্তু সেখানে হানা দেওয়া কোন ধরনের বিবেকসম্পন্ন মানুষের কাজ?

সমালোচনার যুগ বলেই আখ্যায়িত করা উচিত বর্তমান সময়টাকে। সাবার হাতে যেমন স্মার্টফোন সহজলভ্য হয়েছে ঠিক তেমনই মানুষের যেন এখন অঢেল সময়। পাশের মানুষটির সঙ্গে কথা বলার সময় না থাক কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কে কতটা সচল, কার পরিবার কেমন, কে কী পরিধান করছে, কে কার সঙ্গে বেড়াচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কী বলছেন, কী করছেন; সবটাই নখদর্পণে থাকছে। ফলে যেখানে সময় ব্যয় করা উচিত তার বদলে সময়টা যাচ্ছে ভিন্ন জায়গায়। যেই মন্তব্য করে নিজের বিকৃত রুচির, মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন একশ্রেণির মানুষ। ফলে নারীর প্রতি বিরূপ মন্তব্য শুধু যে নিম্নবর্গের প্রতি বা ক্ষমতাহীনের প্রতি, এমন নয়। নারীর প্রতিই একশ্রেণির বিদ্বেষ-বিতৃষ্ণা। ফলে নারীদের এসব মন্তব্য গায়ে মাখলে চলবে না। লক্ষ্য ঠিক রেখে পথ চলাই হোক নারীর ব্রত।