Skip to content

২রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৭ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মুক্তি

একুশে ফেব্রুয়ারি। দু বছর পর আবার সবুজসহ প্রভাতফেরিতে যাবো, বেশ মজা হবে। প্রকৃতি তখনো পুরোপুরি আড়মোড়া ভাঙ্গেনি। জেগে কেবল চোখ কচলাচ্ছে। আমরা দু বন্ধু ফেরির দিকে। কিছুদুর এগুতেই এক মনুষ্যকণ্ঠের চেঁচামেচির আওয়াজ কানে লাগে। চোট দেখাচ্ছে। ক্রোধের বারুদগুলো যেন জ্বলে উঠছে। এ আলো-আঁধারে লোকটিকে অচেনাই লাগছে। কাছে গিয়ে দেখি, উনি আর কেউ না, এক আধাবয়সি কলেজশিক্ষক। বাগানের ফুল চুরি হয়েছে, তাই এ বকাঝকা। বললাম, স্যার, ফুলের মাধুরী সকলকে আকৃষ্ট করে। আকৃষ্টজনরা সহজভাবে পায় না বলেই পাওয়ার প্রক্রিয়াটা একটু ভিন্ন করে নেয় যেটাকে আপনি চুরি বলছেন। তাছাড়া আপনার এ ফুলগুলো তো শহীদমিনার রাঙিয়ে তুলবে! সেখানে একুশের চেতনা আগলে রাখতে কিংবা শানিত করতে শপথ হবে। ক’জন লোকেরই বা বাগানের ফুল শহীদমিনারে শোভা পাবার সৌভাগ্য লাভ করে। কথা শেষ হতে না হতেই স্যার বেচারা ধমকের স্বরে বললেন:

 

— অই ছোকরারা, তোমরা তো সেদিনের পিচ্চি। একুশের তোরা কি বোঝ? প্যাঁচাল বাদ দিয়ে সোজা রাস্তা মাপো। প্রাণটা আমার ছিঁড়ে নিয়ে গেছে, তা তো তোরা বুঝলে না!
–বুঝি, স্যার। আপনার এ প্রাণ দিয়ে লালিত ভালবাসা যদি শহীদমিনারে দেয়া হয়, তা তো আপনারই গর্বের বিষয়।
–তাই বলে কি চুরি করতে হবে! যেন অপসংস্কৃতি—
—তাহলে স্যার একটা কাজ করুন। প্রতি বছর ২০ ফেব্রুয়ারি বাগানে একটু কষ্ট করে লিখে দিবেন-“একুশের জন্য ফুল চুরি অপসংস্কৃতি। বলে কয়ে ইচ্ছেমতো নিলে মালিকের কোন আপত্তি থাকবে না।”
—বাহ, বেস্ট আইডিয়া! তাই করবো। কিন্তু জানো “They broke my heart, broke my heart, broke my heart'' বলতে বলতে ভিতর বাসায় যেতে লাগলেন।

 

এই ভোরবেলায় ফুল চুরি নিয়ে একজন কলেজ শিক্ষকের মনের ঝাল ঝারাঝারি আমাদের কেনজানি ভাল ঠেকলো না। যাহোক, আমরা প্রভাতফেরিতে গেলাম। বিশাল ভ্রাম্যমাণ দল-সকলের পা খালি। এ যেন ঐক্যেরই প্রতীক। নীরব-ভাবে আমাদের এগিয়ে যাওয়া। সকলের আবেগে আবেগে কত শ্রদ্ধা, কত ভালবাসা যে নি:শব্দে অনুরণিত হচ্ছিল, তার ইয়ত্তা নেই। শহীদমিনার হতে ফেরার পথে আমরা দু বন্ধু দলছুট হয়ে সকালের শহরটাকে উপভোগ করছি। হাঁটাপথে অনেক কথা, অথচ পেটে জমে থাকা কথাগুলো যেন ফুরাতে চায় না। অনেক দিন পর প্রিয়বন্ধুকে কাছে পেলে যা হবার,তাই হচ্ছিল। আচমকা পিছন হতে অপরিচিত তৃতীয় একজন ” আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি” গাইতে গাইতে আমাদের সামনে এলো। চোখে মুখে যেন আনন্দের বান। বললো- 

 

—এই ভায়েরা, অনেকক্ষণ ধরে তোমাদের কথা-বার্তা চলছে। এতে হয়তো আনন্দ পাচ্ছো, বেদনা পাচ্ছো কিংবা ভাবছো—জানো, এসব একান্ত তোমাদের। এতে আছে তোমাদের একান্ত সহজতা। আর তা কিন্তু ভাষাই দিয়েছে। আমি তোমাদের এ মজে যাওয়া কথা-বার্তায় ভাষার স্বাধীনতা দেখতে পাচ্ছি। এ বলে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি” গাইতে গাইতে চলতে শুরু করলো।
—আর একটু থামুন, বেশ ভাল লাগছে আপনার কথাগুলো।
—দেখতে হবে না বাংলা ভাষার কথা। কিন্তু গানটি ভাল লাগছে না বুঝি!
—লাগছে, বড় ভাল লাগছে।
—তাহলে নাও, এ ফুল দুটো নাও।
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি” গাইতে গাইতে লোকটি চলে গেল।

 

একটি দল যাচ্ছিল। স্কুলের কচি কাঁচা শিক্ষার্থীদের দল। কি দৃশ্য! পৃথিবীর আর দশটি নয়ন-জুড়ানো দৃশ্যের যেন অন্যতম! প্রত্যেকেই আজ যেন এক একটা বর্ণ হয়ে বর্ণমালা সেজেছে। এরা যেন আমাদের বুকের আশা, মুখের ভাষা। একটু দাঁড়ালাম। অনাহুতের মত একজন আমাদের পরিচয় নিতে লাগলো। ছেলেটি আমাদের সমবয়সী। নতুন লোকের সাথে পরিচিত হওয়া, আলাপ করা নাকি তার প্রিয় শখ। কিছুক্ষণ আমরা নির্বাক। ছেলেটিই কথা বলা শুরু করলো।

—তোমরা কদ্দুর যাবে? সবুজ বললো
—রোকেয়া কলেজের মোড়।
—আমি আরেকটু দূরে যাবো। তাহলে একসাথেই যাওয়া যাক। আমরা বললাম
—তাহলে গল্প করতে করতে যাওয়া যাক। একটা গল্প ধরো।
—বেশ। বলবো বলবো। লেটেস্ট গল্প বলবো—তাও আবার আমার নিজের জীবনের গল্প। সবুজ বলে ফেললো
—জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প।
—নারে ভাই, তাও নেই। সব চুকে গেছে।
যা হোক আপাতত ছেলেটি গল্পকথক। সে তার জীবনের লেটেস্ট গল্প বলা শুরু করলো।

 

জানো সেই ছোটবেলা থেকে ভাষার সাথে আমার আলাদা ধরণের একটা ভালবাসা গড়ে ওঠে। লোকমুখের কথা-বার্তা, গান কিংবা কবিতা আবৃত্তি শুনলেই আবেগে ভাস্কর্যসূলভ নীরব-নিস্তব্ধ-নিশ্চল হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম। বই পড়া কিংবা লিখতে গেলে ভাষার অস্তিত্বে যেন নিজেকে হারাই। মনে অজস্র ভাব, অসংখ্য শব্দের ঝাঁক–ওরা শ্লোগান দেয় কলমের নিবে আসতে। সুস্থির করলাম, সুন্দর করে তো কথাবার্তা বলতে পারি না, তা হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা দিয়ে, প্রকৃতির সব রূপ-রঙ-রস দিয়ে ভাষাকে সাজাবো। ভাষাকে অলংকার পরাবো সমাজের হাসি-কান্না-ভাবনা দিয়ে। ভাষাকে শতরূপে অপরূপা করে তুলবো। কবিতা লিখবো। শুরু হলো কচি হাতের লেখা। একুশকে নিয়েই শুরু। পত্র পত্রিকায় একটু আধটু ছাপা শুরু হলো। ক’ বছরেই আমি আমার এলাকার তরুণদের কাছে তরুণ কবি হিসেবে পরিচিত হলাম। উৎসাহ বেড়ে গেল আমার। তাই মানুষ যখন রঙ্গিন কল্পনাকে সাজায়, আমি তখন ব্যস্ত ভাষাকে সাজাতে। কবিতার সাথে একটা বড় ধরণের ভালবাসা গড়ে ওঠলো। কবিতাই হলো একমাত্র কামনার ধন, সাধনার ধন।

 

ইতোমধ্যে আমার এ সাজানো ভাষা কবিতা পড়ে এক পাঠিকা দুর্বল হয়ে পড়ে আমার প্রতি। নিবেদন করে শুদ্ধতম ভালবাসা। তাও আবার “আমি তোমাকে ভালবাসি” শিরোনামের স্বরচিত কবিতা দিয়ে। ভাবলাম, কেউ যদি সম্পূর্ণরূপে পেতে চায়-তা তো গর্বের। যার জীবনে এমনটি নেই, তা জীবন হলো নাকি! তাছাড়া আমার সাজানো ভাষাই তো এ ভালবাসার কারণ। পত্রের পর পত্র। কত কবিতা, কত গান, কত স্বপ্ন, কত হাসি-কান্না ভাষার শৈল্পিক সৌন্দর্যে সুসজ্জিত পেলাম তার ইয়ত্তা নেই। আমিও তার সাজানো ভাষার কাছে এই প্রথম নিজেকে হারালাম। হৃদয়ের সমস্ত কিছু দিয়ে ভালবেসে এক নিরাপদ জীবন পেলাম। কিন্তু হারালাম কবিতাকে। সমস্ত শব্দ, ভাব, আবেগ এখন মেয়েটিকে সাজাতে পরিব্যস্ত। সমস্ত স্বপ্ন, কল্পনা, কামনা, সাধনা সেই শান্ত মেয়েটিকে ঘিরে। কবিতা আর লেখা হয়ে ওঠে না। ভাব ভাষা তো একেবারই উধাও।

সবুজ জোক করে বলে:
—আরে ভাই, মানুষ প্রেমে পড়লে কবিতা লেখা শিখে, আর তুমি কবি, অথচ প্রেমে পড়ে কবিতা লেখাব ভাব ভাষা হারাও, এ কেমন কথা!

গল্পকথক: মানুষ কবি হতে পারে। আমি কবিতা হারিয়েছি। পেয়েছি আরেক জীবিত কবিতা মেয়েটিকে। যাহোক শুরুতেই এ প্রেম জানাজানি হলো। লোকেরা বহুজাতিক বাহিনী নিয়ে বাগদাদ নগরীর মত আমাদের ভালবাসার গলা টিপে ধরে। নানা প্রতিকূলতায় জড়োসড়ো ছিল আমাদের ভালবাসা শুধু পত্রের সাজানো ভাষায়। মেয়েটি এতো ভালবেসেছিল যে পৃথিবীর কোন প্রেমিকা তার প্রেমিককে হয়তো এতো ভালবাসতে পারে নি। কিন্তু কি থেকে কি হলো জানি না—মেয়েটি এক বছর বাইশ দিনের লালিত ভালবাসা থেকে মুখ ফিরিয়ে আট পৃষ্ঠার রিলিজ লেটার দিলো এই তো গত সপ্তাহে। যে মানুষটি ক’দিন আগে পৃথিবীর সবচে আপন ছিল, সেই আমি মানুষটি আজ সবচে ঘৃণার পাত্র! লেটারে অনুযোগ—আমি নাকি প্রতারক। হৃদয় কিংবা ভালবাসা বলতে কিছুই নেই আমার! এই প্রথম কোন সাজানো ভাষা আমার কাছে বিষের মতো লাগলো।

সবুজ আর আমি তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছিলাম। তার চোখের প্রকোষ্ঠে দু’ফোটা জলও জমেছে—পৃথিবীর সব বেদনা যেন সেখানে ঘনীভূত হয়ে আছে! আমরাও ব্যথিত হলাম অজান্তে।

গল্পকথক বলছিলো—
জানো, আজ আমি কবিতা এবং মেয়েটি উভয়ের কাছেই প্রতারক। এ বলেই আবেগে আপ্লুত গল্পকথক চিৎকার করে : "কবিতা থেকে আমাকে সরালো যে বিধাতা, কাঁদাও তাকে স্বর্গসুখে…'' কিছুক্ষণ পর সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে এবং বলে উঠে: আমি বৃত্ত ভেঙ্গে বিশালতায় যাবো–কবিতার নিলয়ে যাবো—সে আবৃত্তি শুরু করলো, "কবিতা, বের হও, ফিরে এসেছি সে-ই আমি/সবাই প্রতারক বলে অন্তত তুমি বলো না/দেখো রামধনুর সাতরঙ/আমার কলমে/হিমালয়সম বিরহবেদনা আমার এ বুকে/দেখো সে-ই ভালবাসা এখনো হৃদয়ে"… 

 

কান্নার মধ্য দিয়ে গল্পকথক তার জীবনের গল্পের যবনিকা টানে। আমরা নির্বাক। এমন গল্প শোনতে চাইনি—কীভাবে জানি শোনা হয়ে গেল। তখনো রাস্তায় অনেক দল শহীদমিনারের দিকে। একটি দলকে দেখি ধীর পদক্ষেপে নিরবভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের পাশে থাকা গল্পকথককেও দেখলাম কেঁদে কেঁদে ধীর ভঙ্গিতে হাঁটা আর ভাবখানা দেখিয়ে তাদের যেন সাথী হলো! একটু পিছনে আরেকটি দল “ভাষা দিবস—অমর হোক”, “শহিদ দিবস—অমর হোক” শ্লোগান দিয়ে আসছিল—গল্পকথকও হেসে হেসে দরাজ কণ্ঠে সুতীব্র আওয়াজ তুললো। পাশাপাশি তৃতীয়জন—যে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো …” গান গেয়ে এসেছিল—তাকেও দেখি এখানে। সে বলছে: ” আমি ভাষার স্বাধীনতা দেখেছি।” একটু পিছনে দেখি সে-ই কলেজ শিক্ষক ফুল হাতে শহীদমিনারের দিকে—যিনি ভোরবেলায় ফুল চুরিতে চেঁচামেচি করছিলেন। আমরা রোকেয়া কলেজের মোড় আসতেই গল্পকথক বিদায় নিয়ে বললো-

—দেখা হবে আবার, বারবার। বললাম
—কোথায়?
—সাজানো ভাষা কবিতায় 

আমরা এখন বাড়ির দিকে এগুচ্ছি। অনেক ভাবছি। কিন্তু ভেবে চিন্তে কোন উত্তর পাচ্ছি না—ঐ গল্পকথকের কেঁদে কেঁদে মৌন-মিছিলের ভঙ্গি, হেসে হেসে ‘অমর হোক’ চিৎকার, তৃতীয়জনের “আমি ভাষার স্বাধীনতা দেখেছি”র প্রাণবন্ত উচ্চারণ, আর কলেজ শিক্ষকের ফুল হাতে শহীদমিনারের দিকে এগিয়ে যাওয়া—যিনি স্ত্রীর চোখের আড়ালে বাগান হতে ফুল চুরি করে আজ শহীদমিনারের পথে।