৮ নভেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২৩ কার্তিক ১৪৩৩
নারী

কাজলা নদীতে নারীদের নৌকাবাইচ, বৈঠার ছন্দে মাতল দুই পাড়

narail-boar-race-2611080819 (1)

নদীর বুকে বৈঠার ছন্দ, ঢাকঢোলের বাদ্য আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছিল নড়াইলের কাজলা নদী। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও যে নৌকাবাইচে সমান পারদর্শী, তা নিজেদের দক্ষতায় প্রমাণ করলেন ১৬টি নারী দলের প্রতিযোগীরা।

হেমন্তের সোনালি বিকেল। নদীর পানিতে পড়েছে রোদের ঝিলিক। সেই পানির বুক চিরে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে একের পর এক নৌকা। প্রতিটি নৌকায় বৈঠা হাতে একদল নারী। ঢাকঢোলের শব্দ আর গানের তালে তালে তাদের বৈঠা চালানোর দৃশ্য উপভোগ করছেন নদীর দুই পাড়ে জড়ো হওয়া হাজারো দর্শক।

গত শনিবার নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটি ইউনিয়নের হাতিয়াড়া এলাকায় কাজলা নদীতে অনুষ্ঠিত হয় ব্যতিক্রমী এই নারীদের নৌকাবাইচ। নারীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতা ঘিরে পুরো এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

ছবি:সংগৃহীত

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর এগারোখান অঞ্চলের ১৬টি নারী দল প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। নড়াইল ও যশোরের ১১টি গ্রাম নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলের প্রতিটি নৌকায় ছিলেন ছয় থেকে সাতজন নারী। তবে নৌকা চালনায় সহযোগিতার জন্য কোনো কোনো দলে একজন বা দুজন পুরুষ সদস্যও ছিলেন।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে স্থানীয় অলোকাপুরী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিযোগিতাটির আয়োজন করে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই আয়োজনে প্রথম স্থান অর্জন করে নড়াইলের গুয়াখোলা গ্রামের মুক্তা অধিকারীর দল। দ্বিতীয় হন হাতিয়াড়া গ্রামের ববিতা সরকার এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করেন একই গ্রামের রীনা বিশ্বাসের দল।

শৈশবের অভ্যাস থেকে প্রতিযোগিতার মঞ্চে

Advertisements

এই নৌকাবাইচের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন পুতুল মজুমদার। তার নেতৃত্বাধীন দলে ছিলেন আটজন নারী এবং সহযোগিতায় ছিলেন দুজন পুরুষ। শৈশব থেকেই নৌকা চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে পুতুলের। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তালগাছের ডোঙা ও বাঁশ-কাঠের বৈঠা দিয়ে নৌকা চালানো শিখেছিলেন তিনি। তবে সেই সময়ে নারীদের নৌকা চালানোকে সমাজের সবাই ইতিবাচকভাবে দেখতেন না।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পুতুল জানান, প্রথম দিকে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বিষয়টি পছন্দ করতেন না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নারীদের সক্ষমতা ও অবদান দেখে তাদের মনোভাব বদলে যায়।

২০১৪ সালে এলাকার একটি ছোট খালে ছেলেদের নৌকাবাইচ দেখে অনুপ্রাণিত হন তারা। এরপর নিজেরাও নৌকা নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন। শিল্পী এস এম সুলতানের স্মরণে আয়োজিত নৌকাবাইচেও কয়েকবার অংশ নিয়েছেন তারা। এখন আর এ নিয়ে তেমন বাধার মুখে পড়তে হয় না বলে জানান পুতুল। নারীদের আরেকটি দলের নেতৃত্বে ছিলেন মনিহর পাল। ছোটবেলা থেকেই নৌকা চালানোর অভ্যাস থাকলেও বিয়ের পর স্বামীর কাছ থেকে বাধা পেয়েছিলেন তিনি। শাড়ি পরে নদীতে নৌকা চালানোকে স্বামী ভালো চোখে দেখতেন না। তাই অনেক সময় নৌকাবাইচ দেখতে যাওয়ার কথা বলে নদীতে নৌকা চালাতে যেতেন মনিহর। তবে এখন পরিস্থিতি বদলেছে। মনিহর মনে করেন, ভবিষ্যতে নারীদের নৌকাবাইচে পুরুষদের সহযোগিতার প্রয়োজন না রেখে পুরো প্রতিযোগিতার দায়িত্ব নারীদের হাতেই দেওয়া উচিত।

নৌকাবাইচ ঘিরে গ্রামীণ মেলার আমেজ

নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে কাজলা নদীর দুই পাড়ে বসে নানা ধরনের দোকান। বাঁশ ও বেতের তৈরি কুলা, ডালা, চালুনি, ঝুড়িসহ গ্রামীণ ঐতিহ্যের বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে হাজির হন স্থানীয় বিক্রেতারা। ষাটোর্ধ্ব রুমি রানীও নিজের তৈরি বাঁশ-বেতের সামগ্রী নিয়ে বসেছিলেন মেলায়। তার ভাষ্য, দর্শনার্থীদের অনেকে এসব পণ্য কিনছেন। নৌকাবাইচের পাশাপাশি এমন আয়োজন স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্যও বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে।

শুরু হয়েছিল চারটি নৌকা দিয়ে

নারীদের এই নৌকাবাইচের ইতিহাস অবশ্য বেশ পুরোনো। ২০০৯ সালে অলোকাপুরী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্যোগে বৃহত্তর এগারোখান অঞ্চলের নারীদের নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রতিযোগিতাটি শুরু হয়। সে সময় অংশ নিয়েছিল মাত্র চারটি নৌকা। কেন্দ্রটির সভাপতি বনানী বিশ্বাস জানান, এলাকার অধিকাংশ নারী ছোটবেলা থেকেই ডোঙা ও নৌকা চালাতে অভ্যস্ত। পুরুষদের নৌকাবাইচ দেখে তাদের মনে হয়েছিল, নারীদের নিয়েও এমন একটি আয়োজন করা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এবার বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগের পর আয়োজনটি জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বছর মোট ১৭টি নৌকা এলেও জোড়া মেলাতে না পারায় শেষ পর্যন্ত ১৬টি নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।

গ্রামীণ সংস্কৃতি তুলে ধরার উদ্যোগ

নারীদের নৌকাবাইচের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুন করে তুলে ধরা এবং দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এ ধরনের আয়োজনের উদ্দেশ্য।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান সামীমুজ্জামান। এ সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য, পর্যটন করপোরেশনের কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগের দিন শুক্রবার বিকেলে নড়াইলের বড়দিয়ায় নবগঙ্গা নদীতে পুরুষদের নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় উদ্যোগে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত দুটি নৌকা অংশ নেয়। তবে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার।

নারীদের বৈঠায় মুগ্ধ দর্শনার্থীরা

কাজলা নদীর এই আয়োজন দেখতে নড়াইল ও যশোরের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য মানুষ ছুটে আসেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যশোর থেকে আসা সুস্মিতা ঘোষ জানান, জীবনে প্রথমবার নারীদের নৌকাবাইচ দেখেছেন তিনি। তার কাছে পুরো আয়োজনটি ছিল দারুণ উপভোগ্য।

সুস্মিতার মতে, সাধারণত নৌকাবাইচে পুরুষদের অংশগ্রহণই বেশি দেখা যায়। কিন্তু নারীরাও যে দক্ষতার সঙ্গে এমন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন, এই আয়োজন তারই প্রমাণ।

কাজলা নদীর বুকে নারীদের এই বৈঠা চালানো তাই কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল না; এটি ছিল নারীর সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক পরিবর্তনেরও এক প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা গ্রামীণ ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে আয়োজনটি পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। নদীর ঢেউয়ে বৈঠার ছন্দ আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস যেন বলে দিয়েছে—সুযোগ পেলে নারীরাও এগিয়ে নিতে পারেন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সমাজকে।

Advertisements