৪০০ বিয়ের ঘটকালি করেছেন এশরা বেগম, বদলে যাচ্ছে পাত্র-পাত্রী খোঁজার ধরন

রংপুরের তারাগঞ্জের এশরা বেগম। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে ঘটকালি পেশার সঙ্গে যুক্ত তিনি। এই সময়ে চার শতাধিক বিয়ে দিয়েছেন। একসময় যেখানে ঘটক ছাড়া বিয়ের কথা ভাবাই কঠিন ছিল, সেখানে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে পাত্র-পাত্রী খোঁজার ধরন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মুঠোফোনের ব্যবহার বাড়ায় কমেছে ঘটকদের ওপর নির্ভরশীলতা।
তারাগঞ্জের ইকরচালী হাটের একটি কাপড়ের দোকানে বসে পাত্র-পাত্রীদের জীবনবৃত্তান্ত দেখাচ্ছিলেন এশরা বেগম। কারও ছেলের জন্য পাত্রী খোঁজা, আবার কারও মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান—দুই পরিবারের চাহিদা মিলিয়ে সম্বন্ধ তৈরির চেষ্টা করছিলেন তিনি।
১৯৯৬ সালের দিকে আত্মীয় নজরুল ইসলামের মাধ্যমে ঘটকালির কাজে যুক্ত হন এশরা। প্রথমবার রংপুরের এক কাপড় ব্যবসায়ীর জন্য পাত্রী খুঁজে দেন। সেই বিয়ে সফল হওয়ার পর আরও কয়েকটি সম্বন্ধ করানোর চেষ্টা করেন। প্রথম চারটি ঘটকালি ব্যর্থ হলেও পঞ্চমবার সফল হওয়ার পর নিয়মিত এই পেশায় যুক্ত হন তিনি।
এরপর ধীরে ধীরে আশপাশের এলাকায় পরিচিতি বাড়তে থাকে। পাত্র-পাত্রী খুঁজে দেওয়া, দুই পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া এবং দেখাদেখির ব্যবস্থা করাই হয়ে ওঠে তাঁর প্রতিদিনের কাজ। দীর্ঘ সময়ে চার শতাধিক বিয়ে সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করেছেন তিনি। এর মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩০টি বিয়েও রয়েছে।
বদলে গেছে পাত্র-পাত্রী পছন্দের মানদণ্ড
এশরা বেগমের অভিজ্ঞতায়, সময়ের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে পরিবারের প্রত্যাশা ও পছন্দের ধরন বদলেছে। আগে পারিবারিক পরিচয় ও বংশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও বর্তমানে চাকরি, কর্মসংস্থান এবং আর্থিক সচ্ছলতা বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
তাঁর ভাষায়, এখন সবাই সৎ, কর্মজীবী ও সচ্ছল পরিবার খোঁজেন। পাত্রের চাকরি থাকলে তাঁকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শুধু তাই নয়, বিয়ের সিদ্ধান্তে নারীদের মতামতের গুরুত্বও বেড়েছে। আগে পরিবারের বড়রা পাত্র পছন্দ করলেই বিয়ের আলোচনা এগিয়ে যেত। বর্তমানে পরিবারের পছন্দ থাকলেও মেয়ের সম্মতি ছাড়া বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা কঠিন।
কমছে ঘটকদের কদর, বাড়ছে চ্যালেঞ্জ
প্রযুক্তির প্রসার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে ঘটকালির প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই এখন নিজেরা পাত্র-পাত্রী খুঁজে নিচ্ছেন। দুই পরিবার সরাসরি যোগাযোগ করে বিয়ের আয়োজন করায় ঘটকদের প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় কমেছে।
এশরা বেগমের কাজেও এর প্রভাব পড়েছে। অনেক সময় দুই পক্ষকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর তারা নিজেরাই যোগাযোগ করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। এতে ঘটক হিসেবে তাঁর প্রাপ্য সম্মানী আর পাওয়া হয় না।
২০২২ সালে এমন একটি ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়েন তিনি। কয়েক দিন ধরে দুই পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ ও দেখাদেখির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি যাতায়াতের খরচও নিজের পকেট থেকে দিয়েছিলেন। পরে দুই পক্ষের মধ্যে দেনদরবার নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় বিয়ের আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এক মাস পর জানতে পারেন, দুই পরিবার নিজেরাই যোগাযোগ করে বিয়ে সম্পন্ন করেছে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে একাধিকবার ঘটেছে।
আয় কমলেও পেশা ছাড়তে চান না
জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এশরা বেগমের জন্ম। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে ঘটকালি পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। দুই মেয়ে ও এক ছেলের বিয়েও দিয়েছেন।
তবে বর্তমানে এই পেশা থেকে আয় করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি বিয়ে সম্পন্ন হলে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সম্মানী পাওয়া যায়। আবার পরিচয় করিয়ে দেওয়া বা দেখাদেখির ব্যবস্থা করার জন্য কেউ ৩০০, কেউ ৫০০ টাকা দেন। অথচ পাত্র-পাত্রী খোঁজা থেকে শুরু করে দুই পরিবারের মধ্যে সমন্বয় করতে যথেষ্ট সময় ও পরিশ্রম ব্যয় করতে হয়।
তবু ঘটকালি ছাড়তে চান না এশরা। মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে দেওয়ার আনন্দই তাঁকে এই পেশায় ধরে রেখেছে।
তাঁর কথায়, ‘বেঁচে থাকার আগপর্যন্ত মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করে যেতে চাই।’



