যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর ডেব হালান্ড

একসময় মেয়ের খাবার জোগাতে তাকে সরকারি খাদ্যসহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। নিজের ঘর ছিল না, রাত কাটাতে হয়েছে বন্ধুদের বাড়িতে। মেয়েকে প্রি-স্কুলে পড়াতে বেতনের টাকা ছিল না। তাই সেখানে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন, মেঝে ঝাঁড়ু দিয়েছেন, শৌচাগার পরিষ্কার করেছেন। সেই নারী এবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। তার নাম ডেব হালান্ড। আড়াইশ বছরের মার্কিন ইতিহাসে কোনো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর হওয়া প্রথম আদিবাসী নারী তিনি।
৩ নভেম্বরের নির্বাচনে হালান্ড পেয়েছেন ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ ভোট, সংখ্যায় ৪ লাখ ১২ হাজারের বেশি। রিপাবলিকান প্রার্থী রিও র্যাঞ্চোর সাবেক মেয়র গ্রেগ হাল পেয়েছেন ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ। ব্যবধান সাড়ে ১৪ পয়েন্ট, যা ভোটের আগের জরিপের হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। চার দশক ধরে নিউ মেক্সিকোতে ডেমোক্র্যাট আর রিপাবলিকান গভর্নর পালা করে আসছিলেন। এবার সেই ধারা ভাঙল। একই রাতে জর্জিয়ায় কেইশা ল্যান্স বটমস দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। মার্কিন রাজনীতিতে নারী প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে রাতটি তাই আলাদা হয়ে থাকল।
ডেব লাগুনা পুয়েবলো জনগোষ্ঠীর নিবন্ধিত সদস্য। পুয়েবলোরা তেরো শতক থেকে এই অঞ্চলে বাস করে আসছে। সেই হিসাবে তিনি নিজেকে নিউ মেক্সিকোর ৩৫তম প্রজন্ম বলে পরিচয় দেন। তার জন্ম ১৯৬০ সালের ২ ডিসেম্বর, অ্যারিজোনার উইন্সলোতে। বাবা ৩০ বছর মেরিন সেনা ছিলেন। ভিয়েতনামে ছয়জনের প্রাণ বাঁচিয়ে পেয়েছিলেন সিলভার স্টার পদক। মা ছিলেন নৌবাহিনীর সদস্য। বাবার বদলির চাকরির কারণে ছোটবেলায় তেরোটি স্কুলে পড়তে হয়েছে তাকে। শেষে পরিবার থিতু হয় আলবুকার্কিতে, লাগুনার আত্মীয়দের কাছাকাছি।
১৯৯৪ সালে স্নাতক শেষ করার চার দিনের মাথায় মেয়ে সোমাহর জন্ম। সন্তানকে তিনি একাই বড় করেছেন। সংসার চালাতে নিজের হাতে সালসা সস বানিয়ে বয়ামে ভরে বিক্রি করতেন। ব্যবসার নাম ছিল ‘পুয়েবলো সালসা’। ক্যাটারিংয়ের কাজও করেছেন। তাতেও মাস চলত না, তাই খাদ্যসহায়তার কার্ড আর মা-শিশুর পুষ্টি কর্মসূচিই ছিল ভরসা। চল্লিশ পেরিয়ে আইন বিষয়ে পড়া শুরু করেন। ২০০৬ সালে নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আদিবাসী আইনে ডিগ্রি নেন। শিক্ষার্থীঋণের বোঝা বয়েছেন বহু বছর।
এবারের প্রচারে এসব কথা তিনি লুকাননি। সভায় দাঁড়িয়ে বলেছেন, তিনি একা মা, এক চাকরি থেকে আরেক চাকরির অপেক্ষায় দিন কাটিয়েছেন। এসব সরল স্বীকারোক্তিই সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সবচেয়ে মজবুত সেতু হয়ে ওঠে।
শুরুটা নিজের জনগোষ্ঠীর ভেতরে। সান ফেলিপে পুয়েবলোর প্রশাসক ছিলেন। লাগুনা ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের বোর্ডে প্রথম নারী সদস্য হন, পরে বোর্ডের চেয়ারপারসনও হন। ২০১৪ সালে লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে লড়াই করে হেরে যান। পরের বছর রাজ্য ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান হন। কোনো অঙ্গরাজ্যে দলের নেতৃত্বে আসা প্রথম আদিবাসী নারী তিনি। ২০১৮ সালে কানসাসের শারিস ডেভিডসের সঙ্গে তিনি মার্কিন কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম দুই আদিবাসী নারীর একজন হন। ২০২১ সালে বাইডেন প্রশাসনে দুজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একজন তিনি। এর আগে দেশের মন্ত্রিসভায় কোনো আদিবাসী ছিলেন না।সমাজসেবা করুন
এই দপ্তরের ইতিহাস খুবই নির্মম। একসময় আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেওয়া আর তাদের সংস্কৃতি মুছে দেওয়ার নীতি এখান থেকেই কার্যকর হয়েছে। সেই দপ্তরের প্রধান হয়ে হালান্ড আদিবাসী বোর্ডিং স্কুলের ইতিহাস খুঁড়ে বের করার উদ্যোগ নেন। ১৮১৯ সাল থেকে সরকারি অর্থে চলা এসব স্কুলে আদিবাসী শিশুদের পরিবার থেকে আলাদা করে তাদের ভাষা আর পরিচয় ভুলিয়ে দেওয়া হতো। হালান্ডের নিজের নানা-নানিকেও আট বছর বয়সে এভাবে পরিবার থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তদন্তে ৪০৮টি স্কুল চিহ্নিত হয়।
২০২৪ সালের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জানায়, অন্তত ৯৭৩ শিশু সেখানে মারা গেছে। মার্কিন সরকার এই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে সেই ক্ষতের হিসাব স্বীকার করল। পুয়েবলোদের পবিত্র ভূমি বিয়ারস ইয়ারস জাতীয় স্মারকের সীমানা আগের প্রশাসন ছোট করে দিয়েছিল। তার সুপারিশেই সীমানা আবার পুরোনো আকারে ফেরানো হয়।
গভর্নরের আসনে বসে তার সামনে কঠিন কাজ অপেক্ষা করছে। চিকিৎসার খরচ কমাতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের মেডিকেইড কাটছাঁটের ধাক্কা সামলাতে হবে। ভেঙে পড়া শিশুকল্যাণ সংস্থা নতুন করে গড়তে হবে, শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়েছে, তাতে রাজ্যের কোষাগারে রাজস্বও বাড়ছে। অথচ সরকারি জমিতে ফ্র্যাকিংয়ের বিরুদ্ধে হালান্ডের অবস্থান পুরোনো। তেলের টাকা আর মাটি-পানি রক্ষার অঙ্গীকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই হবে তার বড় পরীক্ষা।
তবু তার জয়ের তাৎপর্য শুধু একটি অঙ্গরাজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে রাষ্ট্র একদিন আদিবাসী শিশুর ভাষা কেড়ে নিয়েছিল, সেই রাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্যের দায়িত্ব এখন সেই শিশুদেরই এক উত্তরসূরির হাতে। খাদ্যসহায়তার লাইনে দাঁড়ানো একা মা জানেন, দারিদ্র্য কোনো পরিসংখ্যান নয়, এটি প্রতিদিনের লড়াই। ক্ষমতার কাঠামোতে এমন মানুষ পৌঁছালে নীতির ভাষাও বদলাতে পারে। প্রান্তের নারীর জন্য এই জয় তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।



