৮ নভেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২৩ কার্তিক ১৪৩৩
বিবিধ

মায়ের একটি কথাই বদলে দিল জীবন, তৃতীয় লিঙ্গের চৈতির অনন্য সাফল্য

Chaity_7Nov26

‘লোকে যা খুশি বলুক, লেখাপড়াটা ছাড়বি না’—মায়ের এই একটি কথাই বদলে দিয়েছিল তানিশা ইয়াসমিন চৈতির জীবন। নানা প্রতিকূলতা, সামাজিক বৈষম্য ও শিক্ষাজীবনে বিরতির পরও মায়ের স্বপ্ন পূরণে হাল ছাড়েননি তিনি। নিজের প্রচেষ্টায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত।

জীবনের নানা বাধা পেরিয়ে সফলতার গল্প লিখেছেন রাজবাড়ীর তানিশা ইয়াসমিন চৈতি। একসময় অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে এসে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার পড়াশোনা। কিন্তু মায়ের অনুপ্রেরণা তাকে আবারও শিক্ষাজীবনে ফিরিয়ে আনে। ভর্তি হন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে নিজের স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি।

চৈতির জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন তার মা। মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে মায়ের ছিল বিশেষ আগ্রহ। চৈতি জানান, তার মা প্রায়ই বলতেন, ‘লোকে যা খুশি বলুক, লেখাপড়াটা ছাড়বি না। তুই পড়াটা শেষ করবি। সার্টিফিকেটটা আমার হাতে এনে দিবি।’ মায়ের এই কথাগুলোই কঠিন সময়ে তাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।

রাজবাড়ী সরকারি কলেজে ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুরু করেছিলেন চৈতি। অনার্সের প্রথম বর্ষ শেষ করার পর নানা কারণে পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। তবে মায়ের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে পরবর্তী সময়ে আবারও পড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ধাপে ধাপে এগিয়ে যান লক্ষ্যের দিকে।

শুধু শিক্ষাজীবন নয়, কর্মজীবনেও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। নব্বইয়ের দশকে রাজবাড়ীর একটি মফস্বল এলাকায় কৃষক পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা চৈতির। দুই বোনের মধ্যে তিনি ছোট। ছোটবেলা থেকেই নিজের পরিচয় ও মানসিক অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানুষের কটূক্তি তার পথচলাকে সহজ হতে দেয়নি।

তবে পরিবার সব সময় তার পাশে ছিল। বাবা-মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসারের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন চৈতি। নিজেকে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি নিজের কমিউনিটির অন্য মানুষদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

Advertisements

সেই স্বপ্ন থেকেই ২০২০ সালে নিজের জন্মভূমি রাজবাড়ীতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘উত্তরণ বিউটি পার্লার’। বিউটিশিয়ান হিসেবে দক্ষতা অর্জনের জন্য মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নেন। নিজের দক্ষতা আরও বাড়াতে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতেও যান। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় লিঙ্গের আরও তিনজন কাজ করছেন।

চৈতির ভাষ্য, ছোট শহরে ব্যবসার পরিসর সীমিত হওয়ায় এর চেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান করা এখনই সম্ভব হচ্ছে না। পার্লারের আয় দিয়েই নিজের পরিবার এবং সহকর্মীদের সংসার চলে। বিয়ের মৌসুম, ঈদ, পূজা ও পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবের সময় কাজের চাপ বাড়ে। তখন কোনো কোনো মাসে তার আয় ৩০ হাজার টাকারও বেশি হয়।

তবে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথটিও ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। পার্লারের সাইনবোর্ড দেখে অনেকেই আসেন, কিন্তু তার পরিচয় জানার পর কেউ কেউ সেবা না নিয়েই ফিরে যান। আবার নিয়মিত গ্রাহকদের ভালোবাসা ও আস্থাই তাকে টিকিয়ে রেখেছে। অনেক গ্রাহক পার্লার বন্ধ থাকলে এক সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। তাদের মাধ্যমেই নতুন গ্রাহকের সন্ধান পান তিনি।

চৈতির জীবনে সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতাও ছিল হতাশাজনক। ২০১৫ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য কোটা ভিত্তিতে ১৪টি নিম্নপর্যায়ের পদে নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। নির্বাচিত প্রার্থীদের একজন ছিলেন চৈতি। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে প্রার্থীদের লিঙ্গ পরিচয় যাচাইয়ের নামে হয়রানির শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

চৈতি জানান, মৌখিক পরীক্ষা ও নির্বাচনের পর নিয়োগপত্র দেওয়ার এক সপ্তাহ আগে তাদের তৃতীয় লিঙ্গের পরিচয় যাচাইয়ের কথা জানানো হয়। তার অভিযোগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন চিকিৎসকের পরিবর্তে একজন পিয়ন তাকে জনসমক্ষে পরীক্ষা করেন। তার মতে, বিষয়টি ছিল অত্যন্ত অপমানজনক ও মানসিকভাবে কষ্টদায়ক। পরবর্তী সময়ে ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়।

সরকারি চাকরির স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পরই উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন চৈতি। নিজের আগ্রহ ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বিউটি পার্লার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। আইব্রো প্লাকিং, হেয়ার ড্রেসিং, নেইল পেইন্টিং ও মেহেদি দেওয়ার মতো কাজে ছোটবেলা থেকেই তার আগ্রহ ছিল। প্রয়োজন ছিল শুধু যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সুযোগের। অনেকের সহযোগিতা ও ভালোবাসায় সেই অভাব কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন তিনি।

কর্মজীবনের পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্যও কাজ করে যাচ্ছেন চৈতি। তার মতে, এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে মূলধারার পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান না। অথচ যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলে তারাও সম্মানজনক পেশায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই তার কাছে বড় অর্জন।

অবশেষে শিক্ষাজীবনের অসমাপ্ত অধ্যায়ও সফলভাবে শেষ করেছেন চৈতি। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসএস প্রোগ্রামে ভর্তি হন তিনি। ৪.০০-এর মধ্যে ৩.৩০ সিজিপিএ অর্জন করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী হিসেবে এই সাফল্য অর্জন করেন তিনি।

তার এই অর্জনের স্বীকৃতিও মিলেছে। গত ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের হাত থেকে বিশেষ সম্মাননা গ্রহণ করেন চৈতি।

একসময় সামাজিক বাধা ও প্রতিকূলতায় থমকে যাওয়া যে মেয়েটির শিক্ষাজীবন, আজ তিনিই শিক্ষা ও আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার নাম। মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি নিজের কমিউনিটির মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করে চলেছেন তিনি। চৈতির গল্প তাই কেবল একটি ডিগ্রি অর্জনের গল্প নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, পরিবারের ভালোবাসা, অধ্যবসায় এবং নিজের পরিচয় নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার এক অনন্য উদাহরণ।

Advertisements