৮ নভেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২৩ কার্তিক ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

যে রোগের কারণে রোগী প্রতিদিন হাসেন, কিন্তু আনন্দ পান না

IMG_c75f0fe7-80c6-4f13-9cc2-bc3cbd4082c3

হাসি মানেই কি আনন্দ? সাধারণত কেউ হাসলে আমরা ধরে নিই, তিনি হয়তো কোনো মজার ঘটনা উপভোগ করছেন কিংবা ভালো আছেন। কিন্তু সব হাসির পেছনে আনন্দের অনুভূতি থাকে না। কখনো কখনো হাসি হতে পারে মস্তিষ্কের জটিল কোনো রোগের লক্ষণ। এমনই এক বিরল রোগের সন্ধান পেয়েছেন চিকিৎসকেরা, যেখানে রোগী প্রতিদিন অকারণেই হাসেন, অথচ সেই হাসির সঙ্গে আনন্দের কোনো সম্পর্ক নেই।

৩১ বছর বয়সী এক নারী দীর্ঘদিন ধরে এমন অদ্ভুত সমস্যায় ভুগছিলেন। দিনে অন্তত একবার কোনো কারণ ছাড়াই তাঁর হাসি শুরু হয়ে যেত। হাসির আগে ঘাড় ও বুকের ভেতর এক ধরনের তীব্র অস্বস্তি বা ভয়ের অনুভূতি তৈরি হতো। এরপর শুরু হতো অনিয়ন্ত্রিত হাসি। সেই সময় তিনি কথা বলতে পারতেন না, খাবার গিলতে অসুবিধা হতো, এমনকি শ্বাস নিতেও কষ্ট হতো। প্রতিটি পর্ব স্থায়ী হতো কয়েক সেকেন্ড। বেশির ভাগ সময় সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এমন ঘটনা ঘটত।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ধরনের হাসিকে বলা হয় ‘আনন্দহীন হাসি’। তবে বিষয়টি নতুন নয়। শৈশব থেকেই ওই নারীর মধ্যে এমন প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। ছোটবেলায় দিনে ছয় থেকে সাতবার পর্যন্ত তাঁর হাসির আক্রমণ হতো। কখনো কখনো তা কয়েক মিনিট স্থায়ী হতো, এমনকি ঘুমের মধ্যেও তিনি হেসে উঠতেন। কিন্তু তখন পরিবারের সদস্যরা বিষয়টিকে রোগ হিসেবে বুঝতে পারেননি। তাঁদের ধারণা ছিল, মেয়েটি ইচ্ছা করেই এমন করছে। তাই হাসি থামাতে তাঁকে বকাঝকাও করা হতো। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসির আক্রমণের সংখ্যা ও তীব্রতা কমে এলেও সমস্যাটি পুরোপুরি দূর হয়নি।

সাধারণ পরীক্ষায় ধরা পড়েনি রোগ
সমস্যার কারণ জানতে ওই নারীর মস্তিষ্কের এমআরআই ও ইইজি পরীক্ষা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দফার পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি। পরে চিকিৎসকেরা তাঁর হাসির আক্রমণের ভিডিও বিশ্লেষণ করেন। উপসর্গের ধরন দেখে তাঁদের সন্দেহ হয়, এটি সাধারণ কোনো আচরণগত সমস্যা নয়; বরং এক ধরনের খিঁচুনি।

চিকিৎসকদের ধারণা সত্যি হলে এটি হতে পারে ‘জেলাস্টিক সিজার’। গ্রিক শব্দ ‘জেলাস্টিকোস’ থেকে এই নামের উৎপত্তি, যার অর্থ হাসি। এটি এক ধরনের বিরল মৃগীরোগজনিত খিঁচুনি। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো আনন্দের অনুভূতি ছাড়াই হঠাৎ হাসতে বা মুচকি হাসতে শুরু করেন। হাসির সময় তাঁর আচরণ অনেকটা স্বাভাবিক মনে হলেও এটি আসলে মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের ফল।

এরপর আরও বিস্তারিতভাবে এমআরআই পরীক্ষা করা হলে মস্তিষ্কের গভীরে হাইপোথ্যালামাস নামের অংশে একটি অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হয়। মাত্র পাঁচ মিলিমিটার আকারের এই ক্ষত থেকেই সমস্যার সূত্রপাত বলে ধারণা করেন চিকিৎসকেরা।
রোগটির নাম হাইপোথ্যালামিক হ্যামারটোমা। এটি মস্তিষ্কের একটি বিরল জন্মগত অস্বাভাবিকতা। সাধারণ টিউমারের মতো ক্যানসারজনিত নয়; বরং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক টিস্যুর অস্বাভাবিক সমাবেশের কারণে এটি তৈরি হয়। ভ্রূণের বিকাশের সময়ই সাধারণত এর উৎপত্তি ঘটে। এই অস্বাভাবিকতা থেকে জেলাস্টিক সিজারসহ বিভিন্ন ধরনের খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।

Advertisements

যে রোগ বাড়ার কথা, তা-ই কমেছে বয়সের সঙ্গে
হাইপোথ্যালামিক হ্যামারটোমায় আক্রান্ত অনেকের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খিঁচুনির সমস্যা আরও জটিল হতে পারে। পাশাপাশি আচরণগত সমস্যা, শেখার অসুবিধা এবং শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

তবে এই নারীর অভিজ্ঞতা ছিল ব্যতিক্রমী। তাঁর ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসির আক্রমণ কমেছে, তীব্রতাও হ্রাস পেয়েছে। এর আগে লেভেটিরাসিটাম ও ল্যামোট্রিগিন নামের দুটি খিঁচুনির ওষুধ প্রয়োগ করা হলেও তাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বর্তমানে উপসর্গ তুলনামূলকভাবে কম থাকায় তিনি আর ওষুধ গ্রহণ করছেন না বলে চিকিৎসকদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিকিৎসকেরা তাঁদের প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, তাঁদের জানা মতে, হাইপোথ্যালামিক হ্যামারটোমাজনিত মৃগীরোগের এমন শান্ত ও স্বাভাবিক পরিণতি আগে দেখা যায়নি।

ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দেয়, মানুষের হাসি সব সময় আনন্দের প্রকাশ নয়। কখনো কখনো আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হওয়া কোনো আচরণের আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে বিরল স্নায়বিক অসুস্থতা। তাই কোনো শিশুর অস্বাভাবিক বা অনিয়ন্ত্রিত হাসিকে নিছক দুষ্টুমি ভেবে উপেক্ষা না করে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

Advertisements