শৈশবের নির্যাতনের প্রভাব থেকে যায় মস্তিষ্কে, বলছে গবেষণা

শৈশবে শারীরিক, মানসিক কিংবা যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা শুধু মনে নয়, মস্তিষ্কের গঠনেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে নির্যাতনের মাত্রা যত বেশি, মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রবণতাও তত বেশি। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) মনোবিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘বায়োলজিক্যাল সাইকিয়াট্রি’-তে। গবেষকদের দাবি, শৈশবের নির্যাতন ও মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়ে এটিই অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক গবেষণা।
গবেষণায় নেতৃত্ব দেন ইউসিএলএর মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক টিফানি হো। তাঁর মতে, শৈশবে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বিষণ্নতা ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের (পিটিএসডি) মতো মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই এসব প্রতিকূল অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের গঠনে দীর্ঘমেয়াদি কোনো ছাপ রেখে যায় কি না, তা জানার চেষ্টা করেছেন গবেষকেরা।
গবেষণায় আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক এনআইজিএমএ কনসোর্টিয়ামের সহযোগিতায় আটটি দেশের মোট ৩ হাজার ৭১১ জনের মস্তিষ্কের এমআরআই চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৩৮৯ জন পিটিএসডি ও মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত এবং ২ হাজার ৩২২ জন সুস্থ ব্যক্তি ছিলেন।
অংশগ্রহণকারীদের শৈশবের অভিজ্ঞতা যাচাই করতে একটি স্বীকৃত প্রশ্নমালা ব্যবহার করা হয়। এতে শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, শারীরিক অবহেলা ও মানসিক অবহেলার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। নির্যাতন ও অবহেলার অভিজ্ঞতাকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করে দুটি স্কোর তৈরি করেন গবেষকেরা।
মস্তিষ্কের বাইরের স্তর কর্টেক্সের পুরুত্ব, এর উপরিভাগের আয়তন এবং ভেতরের অংশ সাবকর্টেক্সের আয়তন পরিমাপ করে দেখা যায়, শৈশবে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের কয়েকটি অঞ্চলে স্বাভাবিক বিকাশের তুলনায় ভিন্নতা রয়েছে। বয়স অনুযায়ী মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের তথ্যের সঙ্গে এসব ফলাফল তুলনা করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, নির্যাতনের মাত্রা বেশি হলে থ্যালামাস ও প্যালিডামের আয়তন প্রত্যাশার তুলনায় বড় হতে পারে। অন্যদিকে ইস্থমাস সিঙ্গুলেট কর্টেক্সের কিছু অংশ তুলনামূলক ছোট এবং মিডিয়াল অরবিটোফ্রন্টাল কর্টেক্সের উপরিভাগের আয়তন বড় হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এসব পরিবর্তন তরুণীদের মধ্যে বেশি স্পষ্ট ছিল। এমনকি নারীদের বয়স বাড়ার পরও মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলে এই পরিবর্তনের ধারা বজায় থাকতে দেখা গেছে। গবেষকদের ধারণা, শৈশবে মেয়েদের যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হওয়া কিংবা মানসিক আঘাতের প্রতি মস্তিষ্কের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, শৈশবে অবহেলার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মস্তিষ্কের পরিবর্তনের সম্পর্ক ছিল তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। তরুণীদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের মাঝামাঝি অবস্থিত সিঙ্গুলেট অঞ্চলের উপরিভাগে পরিবর্তন দেখা গেছে। আর তরুণ পুরুষদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ডান পাশের মিডল টেম্পোরাল কর্টেক্সের আয়তন তুলনামূলক কম হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষক হ্যালি ওয়াং জানান, মস্তিষ্কের ৭০টিরও বেশি অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সব অঞ্চলে একই ধরনের পরিবর্তন ঘটে না। কোথাও কর্টেক্সের পুরুত্ব কমেছে, আবার কোথাও বেড়েছে। একইভাবে মস্তিষ্কের কিছু অংশের আয়তন বেড়েছে, অন্য কিছু অংশের আয়তন কমেছে। অর্থাৎ শৈশবের প্রতিকূল অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষকদের মতে, শৈশবের মানসিক আঘাত মস্তিষ্কে একক বা অপরিবর্তনীয় কোনো পরিবর্তন তৈরি করে—এমন ধারণা সঠিক নয়। নির্যাতনের ধরন, ব্যক্তির বয়স ও লিঙ্গের ওপর নির্ভর করে মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তনও ভিন্ন হতে পারে।
তবে মস্তিষ্কের এসব কাঠামোগত পার্থক্য দিয়ে কোনো ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ কিংবা বিকাশগত সক্ষমতা সম্পর্কে সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। গবেষণাটি মূলত শৈশবের নির্যাতন ও মস্তিষ্কের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরেছে।



