৬ নভেম্বর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ২১ কার্তিক ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

সোরিয়াসিস কেন হয়? নিয়ন্ত্রণে যা করবেন

IMG_7487

সোরিয়াসিস ত্বকের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত একটি রোগ। এটি মূলত শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ত্রুটির কারণে হয়। এ রোগে ত্বকের কোষ স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত তৈরি হতে থাকে। ফলে ত্বকে লালচে বা গোলাপি পুরু চাকা এবং সাদাটে আঁশের মতো স্তর দেখা দেয়। নারী-পুরুষ যে কেউ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়।

সোরিয়াসিস পুরোপুরি নিরাময়ের স্থায়ী চিকিৎসা এখনো নেই। তবে সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাপনে পরিবর্তনের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

সোরিয়াসিস কেন হয়?

সোরিয়াসিসের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে বংশগত প্রবণতা ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার অস্বাভাবিক কার্যক্রমকে এর প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সাধারণত রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা শরীরকে জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে এটি ভুল করে সুস্থ ত্বকের কোষকে আক্রমণ করে। ফলে ত্বকের কোষ তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং দ্রুত নতুন কোষ তৈরি হতে থাকে।

এ ছাড়া কিছু বিষয় সোরিয়াসিসের উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন—

Advertisements
  • গলা বা ত্বকে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ।
  • ত্বকে আঘাত, কেটে যাওয়া বা পোকামাকড়ের কামড়।
  • শীতল ও শুষ্ক আবহাওয়া।
  • অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও হতাশা।
  • ধূমপান ও মদ্যপান।
  • উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ, লিথিয়াম ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের কিছু ওষুধ।

সোরিয়াসিসের ধরন

লক্ষণ ও আক্রান্ত স্থানের ওপর ভিত্তি করে সোরিয়াসিসের কয়েকটি ধরন রয়েছে।

প্লেক সোরিয়াসিস: এটি সবচেয়ে পরিচিত ধরন। এতে ত্বকে পুরু, শুষ্ক ও আঁশযুক্ত চাকা তৈরি হয়। সাধারণত কনুই, হাঁটু, কোমর ও মাথার ত্বকে বেশি দেখা যায়।

গাট্টেট সোরিয়াসিস: শিশু ও তরুণদের মধ্যে এ ধরনের সোরিয়াসিস বেশি দেখা যায়। শরীরে ছোট ছোট ফোঁটার মতো আঁশযুক্ত দাগ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে গলার ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের পর এটি দেখা দেয়।

ইনভার্স সোরিয়াসিস: শরীরের ভাঁজযুক্ত স্থানে, যেমন কুঁচকি, নিতম্ব ও স্তনের নিচে মসৃণ লালচে ছোপ তৈরি হয়।

এরিথ্রোডার্মিক সোরিয়াসিস: এটি বিরল ও গুরুতর ধরন। এতে শরীরের অধিকাংশ ত্বক লাল হয়ে যেতে পারে। তীব্র চুলকানি, জ্বালাপোড়া ও চামড়া ওঠার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

যেসব লক্ষণ দেখা দেয়

সোরিয়াসিসের উপসর্গ ব্যক্তি ও ত্বকের রঙ অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

  • ত্বকে পুরু, শুষ্ক ও আঁশযুক্ত চাকা তৈরি হওয়া।
  • আক্রান্ত স্থানে তীব্র চুলকানি ও জ্বালাপোড়া।
  • ত্বক ফেটে যাওয়া এবং কখনো রক্তপাত হওয়া।
  • মাথার ত্বকে খুশকির মতো আঁশ জমা।
  • নখে ছোট ছোট গর্ত তৈরি হওয়া, রং পরিবর্তন ও নখ ভেঙে যাওয়া।
  • জয়েন্টে ব্যথা, ফোলাভাব ও শক্ত হয়ে যাওয়া।

জয়েন্টের এসব সমস্যা দেখা দিলে তাকে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস বলা হয়। এ ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সোরিয়াসিসের চিকিৎসা

সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে রোগের ধরন, তীব্রতা ও আক্রান্ত স্থানের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার সোরিয়াসিসে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কর্টিকোস্টেরয়েড ক্রিম, ভিটামিন-ডি অ্যানালগ, রেটিনয়েড বা বিশেষ শ্যাম্পু ও লোশন ব্যবহার করা হয়।

শুধু ওষুধে উপকার না হলে ফটোথেরাপি দেওয়া হতে পারে। এ পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় অতিবেগুনি রশ্মি প্রয়োগ করে ত্বকের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কমানো হয়।

অন্যদিকে, গুরুতর সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার ওষুধ কিংবা ইনজেকশনের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এসব চিকিৎসা অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিতে হবে।

সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে যা করবেন

ওষুধের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলে সোরিয়াসিসের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।

১. ত্বক আর্দ্র রাখুন: গোসলের পর ভ্যাসলিন বা ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। এতে ত্বকের শুষ্কতা ও ফাটল কমতে পারে।

২. স্বাস্থ্যকর খাবার খান: খাদ্যতালিকায় বাদাম, সামুদ্রিক মাছ, শাকসবজি ও বিভিন্ন ধরনের ফল রাখুন। সুষম খাবার গ্রহণের পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে দিন।

৩. মানসিক চাপ কমান: নিয়মিত হাঁটাহাঁটি, ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন।

৪. ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলুন: এগুলো রোগের তীব্রতা বাড়াতে পারে।

৫. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: অতিরিক্ত ওজন সোরিয়াসিসের তীব্রতা বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন।

৬. ত্বকে আঘাত লাগা থেকে সতর্ক থাকুন: ত্বক চুলকানো, ঘষাঘষি করা বা আঁশ জোর করে তুলে ফেলা থেকে বিরত থাকুন।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

ত্বকে দীর্ঘদিন ধরে আঁশযুক্ত দাগ, চুলকানি বা লালচে চাকা দেখা দিলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। জয়েন্টে ব্যথা বা ফোলাভাব দেখা দিলেও অবহেলা করা উচিত নয়। আর শরীরের অধিকাংশ ত্বক হঠাৎ লাল হয়ে যাওয়া, তীব্র জ্বালাপোড়া বা চামড়া উঠে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

মনে রাখতে হবে, সোরিয়াসিস কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে দূরে সরিয়ে রাখা বা তাঁর সঙ্গে মেলামেশায় ভীতি পাওয়ার কোনো কারণ নেই। সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত যত্নই পারে এ রোগের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

Advertisements