বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ২৩ মে, ২০২৬
অনন্যা শীর্ষদশ

স্থপতি অধ্যাপক খালেদা একরামের দশম প্রাণহানিবার্ষিকী আজ

VC Khaleda Ekram

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রথম নারী উপাচার্য, স্থাপত্য অনুষদের সাবেক অধ্যাপক ও ডিন স্থপতি খালেদা একরামের দশম মৃত্যুবার্ষিকী আজ (২৩ মে ২০২৬)।

২০১৬ সালের এই দিনে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অধ্যাপক একরাম। ২০১৪ সালে অনন্যা শীর্ষদশ পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি।

১৯৫০ সালের ৬ অগাস্ট ঢাকায় জন্ম নেওয়া খালেদা একরামের বাড়ি বগুড়ায়। ১৯৭৪ সালে বুয়েট থেকে স্থাপত্যে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জনের পরপরই বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এরপর ১৯৮০ সালে ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াই থেকে নগর পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

অধ্যাপক খালেদা একরাম বাংলাদেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পাওয়া দ্বিতীয় নারী উপাচার্য। আর বুয়েটে তিনিই প্রথম। ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বুয়েটের উপাচার্যের দায়িত্ব পান। মৃত্যুর আগে মাত্র ২০ মাসের কর্মকালে তিনি সবার মন জয় করে নেন।

সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, অধ্যাপক খালেদা শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত উঁচু মানের এবং দারুণ করিৎকর্মা মানুষ ছিলেন। তবে আজীবনই খুব সাধারণ জীবনযাপন করেছেন।

খালেদা একরাম উপাচার্যের চেয়ারে বসার সময় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, সেশনজটসহ বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা দূর করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নানা উদ্যোগ নেবেন। এক কথায়, সবাইকে নিয়ে কাজ করবেন, যেন কোনো সমন্বয়হীনতা না থাকে। শেষমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সেটিই করেছিলেন।

দায়িত্বপালনকালে দেশের সর্বোচ্চ এ বিদ্যাপীঠে বেশ কয়েকটি অনন্য কীর্তি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।

বুয়েট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে চার বছরের জন্য বুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরই প্রতিষ্ঠানটিতে ‘পদোন্নতি নীতিমালা’ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন খালেদা একরাম। বুয়েট প্রতিষ্ঠার পর কোনো উপাচার্যই এটি বাস্তবায়ন করতে পারেননি। ২০১৫ সালে ১১ মে নীতিমালাটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেন তিনি। এতে বুয়েটের সব শ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছেন।

এছাড়া খালেদা একরামের সময়ে একদিনের জন্যও বন্ধ থাকেনি বুয়েট। যেকোনো উত্তেজনা বা অপ্রীতিকর ঘটনা নিজ হাতে সামাল দিয়ে সুষ্ঠুভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে নিজের যোগ্যতা ও প্রতিশ্রুতির প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।

খালেদা একরামের মৃত্যুর পর প্রসঙ্গক্রমে বুয়েটের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের তৎকালীন ডিন ও ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক জেবুন নাসরীন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মৃত্যুর দুই সপ্তাহ আগে নন হজকিন্স লিম্ফোমা ধরা পড়লেও খালেদা ম্যাডাম তাৎক্ষণিক হাসপাতালে যাননি। মিটিং করেছেন, অফিস করেছেন, কাজের মধ্যেই ছিলেন। অসুস্থতার বিষয়টি আমাদের কাউকে বুঝতে দেননি। ১১ মে (২০১৬ সালের ১১ মে) বিকেলে উপাচার্যের বাসভবনে একটা পর্যালোচনা সভা ডেকেছিলেন তিনি, কিন্তু সেদিন সকালেই আমরা তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তিনি বারবার বলছিলেন, মিটিং শেষ করে হাসপাতালে যাই। পরে আমরা তাকে জোর করেই দুপুরের দিকে হাসপাতালে ভর্তি করি। তখন তার কথা বোঝা যাচ্ছিলো না।’

অধ্যাপক জেবুন নাসরীন আরও বলেন, ‘উনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতেন, প্রতিটা বিষয়ে বিশদভাবে ভাবতেন। অত্যন্ত মৃদুভাষী মানুষটি সবাইকে খুশি করতে জানতেন। যে যা-ই বলুক, তাকে শেষে কিছু একটা বুঝিয়ে মানিয়ে দেওয়ার মতো বিরাট একটা গুণ ছিল উনার।’

জেবুন নাসরীনের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন খালেদা একরাম। ‘ম্যাডাম খুব সৎ মানুষ ছিলেন। আমরা সবাই উনাকে খুব ভালোবাসতাম। সুন্দর করে পড়াতেন, নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াতেন’, বলেছিলেন অধ্যাপক জেবুন নাসরীন আহমদ।

খালেদা একরাম উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষকদের সবসময় উদ্বুদ্ধ করেছেন অ্যাকাডেমিক সেশন ও টার্ম ঠিক সময়ে শুরু করার ব্যাপারে। ফলে তার সময়কালে সেশনজটও কমে আসে।

বুয়েটের উপাচার্যের কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখনো তার স্মৃতিচারণ করে বলেন, এক কথায় অসাধারণ ছিলেন খালেদা ম্যাডাম। আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অনেক কিছু করেছেন তিনি। আমরা তার অধস্তন হলেও সেভাবে কখনও নিজেদের অধস্তন মনে হয়নি। শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আতাউর রহমান বলেছিলেন, উপাচার্য হওয়ার পর তার কর্মনিষ্ঠায় আমরা মুগ্ধ হয়েছিলাম। সেশন ঠিক সময়ে শুরু করা এবং ঠিক সময়ে শেষ করাসহ প্রশাসনিক কাজে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। তিনি বুয়েট নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন, বুয়েটের কাজেই সার্বক্ষণিক লেগে থাকতেন।

খালেদা একরামের মৃত্যুর পর প্রথিতযশা অধ্যাপক (২০২০ সালে প্রয়াত) জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেছিলেন, ‘বুয়েটে খালেদা একরামের আগে ১১ জন উপাচার্য ছিল। যাদের মধ্যে ৩ জনকে আমরা হারিয়েছি। খালেদাই প্রথম উপাচার্য, যিনি কর্মরত অবস্থায় আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে বুয়েটের উন্নয়নে তার সঙ্গে মিলে আমরা অনেক পরিকল্পনা নিয়েছিলাম। যেকোনো বিষয়ে সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে সমাধান করা যায় সেই চিন্তা তার মধ্যে ছিল। স্বল্প সময়ে তিনি বুয়েটের জন্য যা করেছেন এটা বুয়েটের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য স্থান পাবে।’

মৃত্যুর অল্পকিছুদিন আগে অধ্যাপক খালেদা একরামের নন হজকিন্স লিম্ফোমা নামের এক ধরনের ক্যান্সারসহ বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা ধরা পড়ে। পরে তাকে সরকারের সহায়তায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে থাইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দশদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মৃত্যুবরণ করেন তিনি। বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। কেবল নারী হিসেবেই নন, বুয়েটের উপাচার্য হয়ে বাংলাদেশের স্থপতি সমাজের জন্যও গৌরব বয়ে এনেছিলেন খালেদা একরাম। অনন্যা পরিবারও তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে।

অনন্যা শীর্ষদশখালেদা একরামনারীবুয়েটমৃত্যুবার্ষিকীস্থপতিস্মরণ