৪ নভেম্বর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ১৯ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলাদেশ

সেন্টমার্টিনে পর্যটকের চাপ বাড়ছে, বিপর্যয়ের মুখে পরিবেশ

IMG_7419

দীর্ঘ নয় মাসের বিরতির পর পর্যটকদের জন্য খুলছে দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) থেকে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌপথে শুরু হচ্ছে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল। পর্যটন মৌসুম শুরুর খবরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি ও কর্মচাঞ্চল্য। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো এবং দ্বীপে রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়ায় পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এবার দৈনিক পর্যটক প্রবেশের সীমা দুই হাজার থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে। অর্থাৎ পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। একই সঙ্গে মৌসুমের শুরু থেকেই রাত্রিযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্তে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আশাবাদী হলেও পরিবেশবিদদের প্রশ্ন, অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ সামলানোর মতো সুপেয় পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পয়োনিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কি দ্বীপে রয়েছে?

সরেজমিনে দেখা গেছে, পর্যটকদের স্বাগত জানাতে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। রেস্তোরাঁগুলোও খাবারের আয়োজন গুছিয়ে নিচ্ছে। দোকানপাটে তোলা হচ্ছে নতুন পণ্য। দীর্ঘদিন পর্যটক না থাকায় আর্থিক সংকটে পড়া ব্যবসায়ীরা নতুন মৌসুমে লোকসান কাটিয়ে ওঠার আশা করছেন।

এবার পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে জাহাজ চলাচলের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগে টেকনাফ থেকেও সেন্টমার্টিনে যাওয়া যেত। তবে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত কারণে সেই পথ বন্ধ রয়েছে। কক্সবাজার থেকে যাত্রার দূরত্ব বেশি হওয়ায় পর্যটকদের সময় ও খরচ দুটিই বাড়বে। এতে পর্যটকদের আগ্রহ কতটা থাকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে ব্যবসায়ীদের।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা দ্বীপটি ভ্রমণ করতে পারবেন। অনলাইন ভ্রমণ অনুমতিপত্র ও কিউআর কোডের মাধ্যমে পর্যটক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের কথা রয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা।

পরিবেশ রক্ষায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সৈকতে উচ্চ শব্দে গানবাজনা, রাতে পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন আলো ব্যবহার এবং উন্মুক্ত স্থানে বারবিকিউ আয়োজনেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। প্রবাল ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ছেঁড়াদ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াতও নিয়ন্ত্রিত থাকবে। তবে এসব বিধিনিষেধ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

Advertisements

গবেষণায় উঠে এসেছে পরিবেশের অবক্ষয়

সেন্টমার্টিনের পরিবেশগত সংকটের চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দ্বীপে স্থাপনা ও উন্নয়নকাজে ব্যবহৃত এলাকার পরিমাণ ২ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়েছে। একই গবেষণায় ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দ্বীপের প্রায় ২৫ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর অবক্ষয়ের তথ্য উঠে আসে।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ২৯ মে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দ্বীপের ১০৭টি স্থানের পানির গুণগত মান বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, পর্যটন নিষেধাজ্ঞার সময় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা বেড়েছিল। নিষেধাজ্ঞার আগে প্রতি লিটার পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ছিল ৬ থেকে ৬ দশমিক ৬ মিলিগ্রাম। পরে তা বেড়ে ৭ দশমিক ১ থেকে ৭ দশমিক ৪ মিলিগ্রামে পৌঁছায়।

তবে পানির মানের এই পরিবর্তনের একমাত্র কারণ পর্যটন নিষেধাজ্ঞা নয় বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন। পানির তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, লবণাক্ততা ও নাফ নদীর পানির প্রবাহের মতো প্রাকৃতিক বিষয়ও এতে প্রভাব ফেলতে পারে।

পর্যটকের চাপ নিয়ে উদ্বেগ বিশেষজ্ঞদের

সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্বীপের অন্যতম বড় সমস্যা দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পর্যটক বাড়লে প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্যের পরিমাণও বাড়বে। যথাযথভাবে এসব বর্জ্য অপসারণ করা না গেলে সৈকত, সমুদ্র ও প্রবালপ্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি সুপেয় পানির সীমিত উৎসের ওপর চাপ বাড়বে। হোটেল-রেস্তোরাঁর অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য সমুদ্রে মিশলেও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ এবং পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। পর্যটকদের অসচেতন আচরণে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যটকের চাপ সামলানোর মতো পরিবেশগত অবকাঠামো নিশ্চিত না করে সংখ্যা বাড়ানো এবং রাত্রিযাপনের সুযোগ দেওয়া ঠিক হয়নি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়কারী মুনিরা পারভীন রুবা বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশগত ধারণক্ষমতা নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সুপেয় পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পয়োনিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। এতে দীর্ঘ মেয়াদে দ্বীপের পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে।

তিনি জানান, ২০০৯ সালে দ্বীপের অবৈধ হোটেল, মোটেল ও বাণিজ্যিক স্থাপনা অপসারণ এবং প্রবালসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার দাবিতে বেলা জনস্বার্থে মামলা করেছিল। ২০১১ সালে হাইকোর্ট এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। এরপরও অপরিকল্পিত স্থাপনা ও পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি।

অন্যদিকে, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটন বন্ধ থাকায় হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান ও নৌযানসংশ্লিষ্ট মানুষের আয় কমে গিয়েছিল। সেন্টমার্টিনের কটেজ মালিক নুরুল আবছার জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অনেক কটেজ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সংস্কারে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। দ্বীপে বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির সংকটও রয়েছে। এরপরও পর্যটক আসা শুরু হওয়ায় তাঁরা আশাবাদী।

জাহাজ মালিকদের সংগঠন স্কোয়াবের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, প্রশাসনিক অনুমোদনের কারণে এত দিন জাহাজ চলাচল সম্ভব হয়নি। সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ায় বৃহস্পতিবার নির্ধারিত সময়েই জাহাজ চলাচল শুরু হবে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পর্যটক বৃদ্ধির বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয় পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটকদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিষ্কাশনের জন্য দুটি বেসরকারি এনজিও কাজ করছে। দ্বীপের পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কার বিষয়েও প্রশাসন সজাগ রয়েছে।

পর্যটন চালু হওয়ায় স্থানীয় মানুষের জীবিকা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সেন্টমার্টিনের পরিবেশ রক্ষার চ্যালেঞ্জও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে দ্বীপের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।

Advertisements