চার বন্ধুর ‘অ্যামারিলিস’

বন্ধুদের জন্মদিন কিংবা মায়েদের বিশেষ দিনে চমকে দিতে ঘর সাজানোর দায়িত্ব প্রায়ই নিজেদের কাঁধে তুলে নিতেন চার সহপাঠী। রঙিন কাগজ, কাঁচি আর নানারকম সামগ্রী দিয়ে সাজিয়ে তুলতেন ঘর। ছোটবেলার সেই শখ যে উদ্যোগে রূপ নেবে, তা হয়তো ভাবেননি ইলাফ ফারজিয়া নায়িন, রামিসা তারান্নুম শ্রুতি, প্রত্যাশা নাহার ও রিশতা জামান। তবে নানা ঘরোয়া আয়োজন সামলাতে সামলাতেই ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করে তাদের ইভেন্ট ডেকোরেশন প্রতিষ্ঠান ‘অ্যামারিলিস’ (Amaryllis)।

কোভিড-১৯ মহামারিতে যখন স্বাভাবিক জীবন থমকে গিয়েছিল, তখন চার বন্ধু নিজেদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু করার পরিকল্পনা করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু হয় তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথচলা। প্রথম কাজটি ছিল একটি জন্মদিনের আয়োজন। সেই অনুষ্ঠানের কাটআউট ও প্রপস তৈরি থেকে শুরু করে উপকরণ সংগ্রহ এবং সময়মতো পৌঁছে দেওয়া—সবকিছুই নিজেদের হাতে সামলেছিলেন তারা।
শুরুর সেই অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। জন্মদিনের আয়োজন ছাড়িয়ে অ্যামারিলিস এক এক করে বিয়ে, গায়ে হলুদ, আকদ, করপোরেট অনুষ্ঠান এবং ব্র্যান্ড ও পণ্যের ফটোশুটেও কাজ শুরু করে। কখনো একই দিনে তিনটি ভিন্ন স্থানে তিনটি অনুষ্ঠান সাজানোর দায়িত্বও সামলাতে হয়েছে তাদের। চার বন্ধুই সব জিনিসপত্র আনা-নেওয়া করেছেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। এসব অভিজ্ঞতা তাদের শিখিয়েছে পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্ব।
ইভেন্ট ডেকোরেশনের কাজ মানেই দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম, মালামাল এক জায়গা থকে অন্যত্র পরিবহন ও কখনো গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করা। চার তরুণী একসঙ্গে এমন একটি উদ্যোগ পরিচালনা করছেন—শুরুর দিকে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। তবে পরিবারের সমর্থন ছিল সব সময়। উদ্যোক্তারা বলেন, “সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক সময় অনেক ধরনের বাঁধাধরা নিয়ম আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে। কিন্তু আমাদের পরিবার আমাদের এই কাজের ক্ষেত্রে সবসময় ঢাল হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে।”
পরিবারের সমর্থনের পাশাপাশি চার বন্ধুর পারস্পরিক আস্থা তাদের এগিয়ে যাওয়ার বড় শক্তি। কোনো আয়োজনে হঠাৎ সমস্যা তৈরি হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা কাজের চাপে একে অপরকে সহযোগিতা করার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে তাদের দলগত দক্ষতা। কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের কারণে ক্লায়েন্টদের আস্থাও অর্জন করেছেন তারা।
ইলাফ, রামিসা, প্রত্যাশা ও রিশতা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র ও একাডেমিক জীবনেও এগিয়ে গেছেন। ইলাফ পড়াশোনা করেছেন অর্থনীতিতে, এখন তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। রামিসা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। প্রত্যাশা ও রিশতা পড়াশোনা করেছেন স্থাপত্যে। কাজ করছেন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে। তবে অ্যামারিলিসের প্রতি তাদের ভালোবাসা অটুট। উদ্যোগটিকে আরও বিস্তৃত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন তারা।
অ্যামারিলিসের কার্যক্রম সম্প্রতি পৌঁছেছে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারেও। রিশতা জামানের উদ্যোগে সেখানে শুরু হয়েছে ‘অ্যামারিলিস ভ্যাঙ্কুভার’-এর কার্যক্রম। প্রবাসী বাঙালিদের অনেকের কাছ থেকেই ডাক পাচ্ছে অ্যামারিলিস।
ইলাফ জানান, অ্যামারিলিসের পথচলায় প্রথম বড় ওয়েডিং ইভেন্টটি ছিল বিশেষ এক অভিজ্ঞতা। বড় কাঠামো তৈরি, প্রপসের নকশা ও সাজসজ্জার খুঁটিনাটি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে কয়েক দিন ধরে দিন-রাত পরিশ্রম করেছিলেন চার বন্ধু। ক্লান্তি পেরিয়ে অনুষ্ঠান শেষে যখন পুরো আয়োজনটি তাঁদের চোখের সামনে পূর্ণতা পায়, তখন অনুভব করেছিলেন এক অন্য রকম তৃপ্তি।
রামিসা, প্রত্যাশা ও রিশতা বললেন, অ্যামারিলিসকে শুধু একটি ইভেন্ট ডেকোরেশন ব্র্যান্ড হিসেবে নয়, বরং ইভেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতে গুণগত মান ও স্বকীয়তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান চার বন্ধু। পাশাপাশি তাঁদের স্বপ্ন, একটি বড় ক্রিয়েটিভ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, যেখানে সৃজনশীল মানুষেরা কাজের সুযোগ পাবেন এবং তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান।
শৈশবের শখ, পারস্পরিক বিশ্বাস ও নিরলস পরিশ্রমের সমন্বয়ে অ্যামারিলিস আজ চার বন্ধুর যৌথ উদ্যোগের চেয়েও বড় কিছু। এটি সৃজনশীলতাকে পেশায় রূপ দেওয়া, নিজস্ব পরিচয় তৈরি করা এবং নারী উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনাকে তুলে ধরার এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।



