আদুরীর ‘বেনুনী’

করোনাকালে ঘরবন্দি অবস্থায় সময় কাটানোর জন্য দড়ি দিয়ে ঝুলন্ত দোলনা বা হ্যামক তৈরি করেছিলেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী আফিফা আদুরী। হঠাৎ ভাবলেন, দড়ি দিয়ে ভিন্ন কিছু করা যায় কিনা। শখের বশে শুরু করা সেই কাজই একসময় রূপ নেয় অনলাইন উদ্যোগে, যার নাম দেন ‘বেনুনী’। দড়ির বুননে তৈরি নান্দনিক ও ব্যবহার উপযোগী ঘর সাজানোর সামগ্রী নিয়ে এখন এগিয়ে চলছে তার এই উদ্যোগ।

শুরুর দিকে ইউটিউবের টিউটোরিয়াল দেখে দড়ি দিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির কৌশল শিখতে থাকেন আদুরী। সঙ্গে যুক্ত হন তার মা আফরোজা ও ভাই আহনাফ। একে একে তৈরি করতে শুরু করেন প্ল্যান্ট হ্যাঙ্গার, টেবিল রানার, ব্যাগ, পর্দা, ছবির ফ্রেম ও ল্যাম্পশেডসহ নানা ধরনের পণ্য। পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শখের কাজটি ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক উদ্যোগে পরিণত হয়।

আফিফা আদুরীর ছোটবেলা কেটেছে পটুয়াখালীতে। স্কুল ও কলেজের পড়াশোনা ঢাকায় শেষ করে ভর্তি হন রুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে। স্নাতক পর্যায়ে নিজের ব্যাচে প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান অর্জনের পাশাপাশি পেয়েছেন বেস্ট থিসিস অ্যাওয়ার্ড। পড়াশোনা শেষে একটি স্বনামধন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে সহযোগী স্থপতি হিসেবে কাজ করেছেন কিছুদিন। পরে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতকোত্তর করছেন এবং টিএমএ আর্কিটেক্টস-এ কর্মরত আছেন।

স্থাপত্য পেশায় ব্যস্ততার কারণে বর্তমানে বেনুনীর কাজে আগের মতো সময় দিতে পারেন না আদুরী। তবে উদ্যোগটি এগিয়ে নিতে পরিবারের সদস্যরা সঙ্গী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তার স্বামী স্থপতি সাকিব রহমানের পরিবারের সদস্যরাও যুক্ত হয়েছেন এই কাজে। সাকিবের প্রায় আশি বছর বয়সী নানী ফাতিমা খানম আনন্দের সঙ্গে হাতে দড়ি বোনেন। মামা শরিফ কাঁচামাল সংগ্রহ করেন এবং মামী সুরাইয়া অনলাইন অর্ডার অনুযায়ী পণ্য তৈরি করেন এবং আদুরী তা সমন্বয়ের কাজ করেন।

বেনুনীর তৈরি পণ্যগুলো মূলত ঘর সাজানোর পাশাপাশি দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী। বিশেষ করে দেশীয় ও নান্দনিক সাজসজ্জা পছন্দ করেন, এমন ক্রেতাদের কাছে এসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে। পণ্যগুলো সহজে ধোয়া যায় এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার করা সম্ভব। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী অর্ডার নেওয়া হয়। অর্ডার পাওয়ার পর পণ্য তৈরি ও সরবরাহ করতে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। সাশ্রয়ী দামে এসব পণ্য পাওয়া যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বেনুনীর নিজস্ব পেজ রয়েছে। সেখানে পণ্যের ছবি দেখে আগ্রহীরা অর্ডার করতে পারেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েকজন নারীর কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিছুদিন আগে নেদারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ফেয়ার’ নামের একটি আয়োজনে বেনুনীর পণ্য প্রদর্শন করেছিলেন কয়েকজন বাংলাদেশি।
শখ থেকে শুরু হওয়া একটি কাজ কীভাবে পারিবারিক উদ্যোগে রূপ নিতে পারে, বেনুনী তারই উদাহরণ। স্থাপত্য পেশার পাশাপাশি নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বতন্ত্র উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন আফিফা আদুরী। ভবিষ্যতে বেনুনীর পরিসর আরও বাড়ানো এবং এর কার্যক্রম বিস্তৃত করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা।



