২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
উদ্যোক্তার খোঁজে

নারীর স্বপ্ন আর সুতার বুননে গড়ে উঠল ‘মোহিনী’

maria-gomez-collage-1790499591 (1)

চট্টগ্রাম শহরের এক কোণে ১৫ বছর আগে মাত্র ৯২৫ টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু হয়েছিল একটি ছোট উদ্যোগ। সেই সামান্য মূলধন আর নিজের কাজের প্রতি অগাধ বিশ্বাসকে সঙ্গী করে পথচলা শুরু করেছিলেন মারিয়া গোমেজ। সময়ের সঙ্গে সেই উদ্যোগই আজ পরিচিতি পেয়েছে ‘মোহিনী’ নামে।

ছোটবেলা থেকেই সূচিশিল্পের প্রতি আলাদা টান ছিল মারিয়ার। মিশনারি হোস্টেলে বেড়ে ওঠার সময় অন্যরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত, তখন তার আগ্রহ ছিল মিশনারি সিস্টারদের সূচিকর্মের দিকে। মায়ের কাছেই শেখেন ‘ভরাট স্টিচ’। নেভি ব্লু সুতি কাপড়ের ওপর রঙিন সুতা দিয়ে টানা তিন মাসের পরিশ্রমে তৈরি করেছিলেন একটি শাড়ি। মায়ের পরনে সেই শাড়ি দেখে পাওয়া আনন্দই তার মনে সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর করে।

পরবর্তী সময়ে কাজের সূত্রে বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বিদেশি ক্রেতারা তার তৈরি পণ্য কিনতে আগ্রহী হলেও বাড়িতে এসে অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেরই দ্বিধা ছিল। তখন এক জার্মান বন্ধু তাকে একটি স্থায়ী শপ বা প্রদর্শনী কেন্দ্র করার পরামর্শ দেন। তার হাতের কাজ ও আন্তরিকতার প্রশংসা করে সেই বন্ধু বলতেন, এসব কাজ সহজেই মানুষকে আকৃষ্ট করবে। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘মোহিনী’ নামের প্রতিষ্ঠানটি।

উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল মাতৃত্ব। করপোরেট চাকরির নির্দিষ্ট সময়সূচির সঙ্গে সন্তানের যত্ন নেওয়ার বিষয়টি সামলানো তার জন্য কঠিন হয়ে উঠছিল। মেয়েকে অন্যের কাছে রেখে চাকরি করতে চাননি মারিয়া। তাই এমন একটি স্বাধীন কর্মক্ষেত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে নিজের কাজের পাশাপাশি সন্তানকেও সময় দিতে পারবেন।

শুরুর চার-পাঁচ বছর মোহিনীর শোরুমে ছিল নিজস্ব কারিগরদের তৈরি নানা পণ্য। ব্লক, বাটিক, টাই-ডাই, হ্যান্ডপেইন্ট ও সূচিশিল্পের পোশাক ও অনুষঙ্গ দিয়ে সাজানো হতো শোরুম। কিন্তু একপর্যায়ে দক্ষ কারিগরের সংকট দেখা দিলে ব্যবসায়ও এর প্রভাব পড়ে।

সেই পরিস্থিতিতে মারিয়া ব্যবসার ধরনেও পরিবর্তন আনেন। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি গুরুত্ব দেন ‘জিরো ওয়েস্ট’ ফ্যাশন ও আপসাইক্লিংয়ে। ফেলে দেওয়া কাপড়ের ছোট ছোট টুকরো সংগ্রহ করে ঐতিহ্যবাহী কাঁথা স্টিচের মাধ্যমে তৈরি করতে শুরু করেন ব্যাগ, পার্স, ল্যাপটপ পাউচ, নোটবুক কাভারসহ নানা পণ্য।

Advertisements

একসময় যে প্যাচওয়ার্ককে অনেকে জোড়াতালির কাজ বলে উপহাস করতেন, মারিয়ার সৃজনশীলতায় সেটিই হয়ে ওঠে আকর্ষণীয় ও পরিবেশবান্ধব পণ্য। ধীরে ধীরে মোহিনীর প্যাচওয়ার্ক পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও পৌঁছে যায়। পরিত্যক্ত কাপড়কে নতুন মূল্য দেওয়ার এই উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানটির আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।

১৫ বছরের পথচলায় ৯২৫ টাকার প্রাথমিক পুঁজি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ লাখ টাকায়। তবে মারিয়ার কাছে ব্যবসার আর্থিক হিসাবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মানুষের ভালোবাসা ও স্বীকৃতি। চট্টগ্রামের কোনো রেস্তোরাঁয় অপরিচিত কেউ তার কাজ চিনে ফেললে কিংবা কক্সবাজার থেকে কেউ শুধু মোহিনীর প্যাচওয়ার্ক পণ্য কিনতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে এলে সেটিকেই তিনি নিজের বড় অর্জন মনে করেন।

এখন তার স্বপ্ন আরও বড়। এমন একটি কর্মপরিবেশ তৈরি করতে চান, যেখানে অন্তত ৫০০ নারী আত্মসম্মানের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন।

তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য মারিয়ার পরামর্শ—শুধু অর্থ বিনিয়োগ করলেই ব্যবসা সফল হয় না। কাজকে ভালোবাসতে হবে, কাজ শিখতে হবে এবং নিজের কাজের প্রতি মায়া তৈরি করতে হবে। তার মতে, সৃষ্টিশীল কোনো উদ্যোগকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখতে হলে কাজের প্রতি আন্তরিকতা অপরিহার্য।

‘মোহিনী’ এখন শুধু পোশাক বা ফ্যাশন অনুষঙ্গের একটি ব্র্যান্ড নয়। এটি চট্টগ্রামের এক নারীর অধ্যবসায়, সৃজনশীলতা ও টেকসই চিন্তার গল্প। মাত্র ৯২৫ টাকা দিয়ে শুরু করা একটি স্বপ্ন কীভাবে ধীরে ধীরে বড় উদ্যোগে পরিণত হতে পারে, মারিয়া গোমেজের পথচলা তারই উদাহরণ।

সূত্র: সমকাল

Advertisements