তাজা সবজির মতোই পুষ্টিকর হিমায়িত সবজি? জানালেন পুষ্টিবিদ

ব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন বাজার করা কিংবা সবজি ধোয়া, খোসা ছাড়ানো ও কাটাকাটির জন্য সময় বের করা অনেকের কাছেই কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে হিমায়িত সবজি হতে পারে সহজ ও কার্যকর বিকল্প। মটরশুঁটি, ভুট্টা, গাজর, শিম ও ব্রকলিসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায়। এগুলো দিয়ে অল্প সময়েই তৈরি করা সম্ভব স্যুপ, তরকারি, পোলাও, পাস্তা কিংবা বিভিন্ন ধরনের ভাজা খাবার।

তবে হিমায়িত সবজি নিয়ে অনেকের মধ্যে একটি ধারণা রয়েছে, এগুলো তাজা সবজির তুলনায় কম পুষ্টিকর। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। সঠিকভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হলে হিমায়িত সবজিতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুষ্টি বজায় থাকতে পারে। তাই শুধু হিমায়িত হওয়ার কারণে সবজিকে অস্বাস্থ্যকর ভাবার কোনো কারণ নেই।
ভারতীয় পুষ্টিবিদ নমামি আগরওয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে হিমায়িত সবজির পুষ্টিগুণ ও ব্যবহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। তার পরামর্শ অনুযায়ী, হিমায়িত সবজি কেনার সময় কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
১. হিমায়িত সবজিতেও বজায় থাকে পুষ্টিগুণ
হিমায়িত সবজির অন্যতম সুবিধা হলো, এগুলো সাধারণত পরিপক্ব হওয়ার পরপরই সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত ও হিমায়িত করা হয়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে সবজির পুষ্টিগুণ ধরে রাখা সম্ভব হয়। বিশেষ করে কিছু সবজিতে থাকা ভিটামিন, খনিজ ও আঁশের উল্লেখযোগ্য অংশ হিমায়িত করার পরও বজায় থাকতে পারে।
অন্যদিকে, মাঠ থেকে সংগ্রহ করার পর তাজা সবজি বাজারে পৌঁছাতে এবং ভোক্তার রান্নাঘরে যেতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এই সময়ে পরিবহন ও সংরক্ষণের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে কিছু পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
তবে সব হিমায়িত সবজি যে তাজা সবজির চেয়ে বেশি পুষ্টিকর, এমনটি বলা ঠিক নয়। সবজির ধরন, সংগ্রহের পর কত সময় পেরিয়েছে, সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং রান্নার প্রক্রিয়ার ওপর পুষ্টিগুণ নির্ভর করে। তাই তাজা ও হিমায়িত—দুই ধরনের সবজিই স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।
২. সুষম খাদ্যতালিকায় সহজেই রাখা যায় হিমায়িত সবজি
প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত সবজি রাখা সুস্থ থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সময়ের অভাব, বাজারে নির্দিষ্ট সবজির অপ্রাপ্যতা কিংবা সবজি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক সময় নিয়মিত সবজি খাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে হিমায়িত সবজি সুবিধাজনক বিকল্প হতে পারে।
হিমায়িত সবজি সাধারণত আগে থেকেই ধোয়া, বাছাই করা এবং কেটে রাখা থাকে। ফলে রান্নার প্রস্তুতিতে সময় ও শ্রম কম লাগে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাকেট থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ সবজি নিয়ে রান্না করা যায়। এতে অব্যবহৃত সবজি ফেলে দেওয়ার পরিমাণও কমতে পারে।
মটরশুঁটি ও গাজর দিয়ে সবজি ভাজি, ব্রকলি দিয়ে স্যুপ, ভুট্টা দিয়ে সালাদ কিংবা মিশ্র সবজি দিয়ে পোলাও তৈরি করা যায়। এ ছাড়া পাস্তা, নুডলস ও বিভিন্ন ধরনের স্টার-ফ্রাইয়েও হিমায়িত সবজি ব্যবহার করা সম্ভব।
এ ধরনের সবজি দীর্ঘ সময় হিমায়িত অবস্থায় রাখা যায় বলে নিয়মিত বাজার করার প্রয়োজনও কমে। তবে প্যাকেট খোলার পর সংরক্ষণের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে এবং সবজি যেন বারবার গলে আবার জমে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
৩. কেনার আগে প্যাকেটের উপাদান ও লেবেল পরীক্ষা করুন
হিমায়িত সবজি কেনার সময় শুধু প্যাকেটের ছবি কিংবা দাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। পণ্যের উপাদানের তালিকা ও পুষ্টিসংক্রান্ত তথ্য দেখে নেওয়া জরুরি।
সাধারণ হিমায়িত সবজিতে সাধারণত শুধু সবজিই থাকে। তবে কিছু প্যাকেটজাত পণ্যে অতিরিক্ত লবণ, সস, মাখন বা অন্যান্য উপাদান যোগ করা হতে পারে। এসব উপাদানের কারণে খাবারে সোডিয়াম, চর্বি কিংবা ক্যালরির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লবণ গ্রহণ সীমিত রাখতে হয়, তাঁদের প্যাকেটের সোডিয়ামের পরিমাণ পরীক্ষা করা উচিত। একইভাবে, অতিরিক্ত সস বা চর্বিযুক্ত উপাদান মেশানো পণ্য এড়িয়ে চললে খাবারের পুষ্টিমান নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
এ কারণে কেনার সময় এমন হিমায়িত সবজি বেছে নেওয়া ভালো, যাতে অপ্রয়োজনীয় উপাদান যোগ করা হয়নি। প্যাকেটের উপাদানের তালিকা যত সহজ ও পরিষ্কার হবে, পণ্যটি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়াও তত সহজ হবে।
৪. সাধারণ হিমায়িত সবজি বেছে নিন, চাইলে বাড়িতেও সংরক্ষণ করুন
পুষ্টিবিদ নমামি আগরওয়ালের পরামর্শ অনুযায়ী, অতিরিক্ত লবণ বা অন্যান্য উপাদান মেশানো নেই—এমন সাধারণ হিমায়িত সবজি বেছে নেওয়া ভালো। এতে রান্নার সময় নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী লবণ, মসলা ও অন্যান্য উপাদানের পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়।
চাইলে বাড়িতেও মৌসুমি সবজি হিমায়িত করে রাখা সম্ভব। এ জন্য প্রথমে তাজা ও ভালো মানের সবজি বেছে নিতে হবে। এরপর ভালোভাবে ধুয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কেটে নিতে হবে। অনেক সবজির ক্ষেত্রে হিমায়িত করার আগে অল্প সময় গরম পানিতে সেদ্ধ করে সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে নেওয়া বা ব্লাঞ্চিং করা উপকারী। এতে সবজির রং, স্বাদ ও গুণমান বজায় রাখতে সাহায্য করে।
পরবর্তী সময়ে সবজির পানি ঝরিয়ে পরিষ্কার, খাবার সংরক্ষণের উপযোগী প্যাকেট বা পাত্রে ভরে ফ্রিজারের মধ্যে রাখতে হবে। পাত্রে সংরক্ষণের তারিখ লিখে রাখলে কত দিন ধরে রাখা হয়েছে, তা বোঝা সহজ হয়।
তবে শুধু ফ্রিজে রাখলেই সবজি দীর্ঘদিন নিরাপদ থাকবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ফ্রিজারের তাপমাত্রা যথাযথ রাখা, পরিষ্কার পাত্র ব্যবহার করা এবং সংরক্ষণের নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি। বিদ্যুৎ চলে গেলে বা সবজি গলে গেলে তার অবস্থা বিবেচনা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
হিমায়িত সবজি কি তাজা সবজির বিকল্প হতে পারে?
হিমায়িত সবজি নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখার উপযোগী। বিশেষ করে ব্যস্ত জীবনযাপন, বাজারে সবজির সীমিত প্রাপ্যতা কিংবা খাবার প্রস্তুতের সময় কম থাকলে এগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু একটি নির্দিষ্ট ধরনের সবজির ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন রঙ ও ধরনের সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।
তাজা সবজি পাওয়া গেলে তা খাওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী হিমায়িত সবজিও ব্যবহার করা যায়। সবজির পুষ্টিগুণ ধরে রাখতে রান্নার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত সময় ধরে সেদ্ধ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী রান্না করলে কিছু পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিনের ক্ষতি কমানো সম্ভব। সেদ্ধ করার পানি ফেলে দিলে তাতে মিশে যাওয়া কিছু পুষ্টি উপাদানও হারিয়ে যেতে পারে।
হিমায়িত সবজি মানেই পুষ্টিহীন খাবার—এ ধারণা সঠিক নয়। সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করা হিমায়িত সবজি পুষ্টিকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। কেনার আগে উপাদানের তালিকা পরীক্ষা করা, অতিরিক্ত লবণ ও সসযুক্ত পণ্য এড়িয়ে চলা এবং খাবারে বিভিন্ন ধরনের সবজি রাখা—এই অভ্যাসগুলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।



