পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাণী কি সত্যিই মশা?

রাতে ঘুমানোর সময় কানের কাছে ভনভন শব্দ, আর হাত বাড়িয়ে মারতে গেলেই উধাও! আকারে ছোট এই পতঙ্গটি মানুষের কাছে বেশ বিরক্তিকর। তবে মশার ভয়ংকর দিক শুধু এর কামড়ে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন রোগ প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। হাঙর, কুমির কিংবা সাপের মতো প্রাণীর তুলনায় মানুষের মৃত্যুর জন্য মশা অনেক বেশি দায়ী।
একটি হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে মশাবাহিত রোগে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এসব মৃত্যুর বড় অংশের পেছনে রয়েছে ম্যালেরিয়া। মশার শরীরে বাঘের মতো শক্তি নেই, সাপের মতো বিষও নেই। কিন্তু রোগজীবাণু ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতাই একে পৃথিবীর অন্যতম প্রাণঘাতী প্রাণীতে পরিণত করেছে।
সব মশা কি মানুষকে কামড়ায়?
পৃথিবীর সব মশা মানুষের রক্ত খায় না। মূলত স্ত্রী মশা রক্ত পান করে। ডিম তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি সংগ্রহ করতে তাদের রক্তের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে পুরুষ মশা সাধারণত ফুলের মধু ও উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে খাবার সংগ্রহ করে। স্ত্রী মশাও মধু খেতে পারে।
রক্ত খাওয়ার সময় স্ত্রী মশা তার সূচের মতো সরু মুখের অংশ, যাকে প্রোবোসিস বলা হয়, ত্বকের ভেতরে প্রবেশ করায়। এরপর রক্ত শোষণ করে। এ সময় মশার লালার কিছু উপাদান রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়। এই লালার কারণেই কামড়ের জায়গায় চুলকানি ও ছোট ফোলা দাগ দেখা দিতে পারে।
তবে মশা কামড়ালেই যে রোগ হবে, এমন নয়। অধিকাংশ কামড়ের ক্ষেত্রে গুরুতর কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। কিন্তু আক্রান্ত মশা কামড়ালে নির্দিষ্ট কিছু রোগের জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
যেভাবে মশা ছড়িয়ে দেয় প্রাণঘাতী রোগ
মশাবাহিত রোগ ছড়ানোর প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। কোনো সংক্রমিত মানুষকে কামড়ানোর সময় মশার শরীরে রোগজীবাণু প্রবেশ করতে পারে। পরে সেই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে জীবাণু নতুন মানুষের শরীরেও পৌঁছাতে পারে।
মশার মাধ্যমে ছড়ানো রোগের মধ্যে রয়েছে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসজনিত রোগসহ বিভিন্ন সংক্রমণ। এর মধ্যে ম্যালেরিয়া বিশ্বজুড়ে অন্যতম গুরুতর মশাবাহিত রোগ। প্লাজমোডিয়াম নামের একধরনের পরজীবীর কারণে রোগটি হয়। অ্যানোফিলিস গণের সংক্রমিত স্ত্রী মশা এই পরজীবী ছড়াতে পারে।
ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে জ্বর, কাঁপুনি ও ফ্লুর মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রোগটি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।
তবে সব প্রজাতির মশা সব রোগ ছড়ায় না। নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতি নির্দিষ্ট রোগের জীবাণু বহন করে। আর মশার কামড়ে এইচআইভি সংক্রমণের কোনো প্রমাণ নেই।
কেন কাউকে বেশি কামড়ায় মশা?
একই ঘরে কয়েকজন মানুষ থাকলেও দেখা যায়, কারও শরীরে মশার কামড়ের দাগ বেশি, আবার কেউ প্রায় অক্ষত থাকেন। এর পেছনে রয়েছে মানুষের শরীর থেকে নির্গত বিভিন্ন সংকেত।
মানুষ নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করে। মশা এই গ্যাস শনাক্ত করে সম্ভাব্য খাবারের উৎসের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া শরীরের তাপমাত্রা, ঘামের সঙ্গে নির্গত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ এবং ত্বকে থাকা জীবাণুর কার্যকলাপও মশাকে আকৃষ্ট করতে পারে।
কিছু গবেষণায় রক্তের গ্রুপের সঙ্গে মশার আকর্ষণের সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও বিষয়টি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি। তাই কাউকে বেশি মশা কামড়ালেই তাকে অপরিষ্কার মনে করার কোনো কারণ নেই।
মশা তাড়ানোর কোন পদ্ধতি কার্যকর?
মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু বাজারে পাওয়া বিভিন্ন যন্ত্রের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আলো দিয়ে পোকামাকড় আকর্ষণ করে মারার কিছু যন্ত্র মশা নিয়ন্ত্রণে খুব কার্যকর নয়। আবার শব্দের মাধ্যমে মশা দূরে রাখার দাবির পক্ষেও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সীমিত।
মশার বংশবিস্তার রোধ করতে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি। ফুলের টব, ফেলে রাখা পাত্র, বালতি ও অন্যান্য স্থানে পানি জমে থাকলে সেখানে মশা জন্মাতে পারে। তাই এসব জায়গায় পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন।
মশার কামড় এড়াতে ডিইইটি, পিকারিডিন, পিএমডি বা আইআর৩৫৩৫-যুক্ত অনুমোদিত প্রতিরোধক ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে পণ্যের গায়ে দেওয়া নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি মশারি ব্যবহার, ঘরের জানালায় জাল লাগানো এবং শরীর যথাসম্ভব ঢেকে রাখার মাধ্যমেও কামড়ের ঝুঁকি কমানো যায়।
কোটি কোটি বছর ধরে টিকে আছে মশা
মশার ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, জুরাসিক যুগ থেকেই পৃথিবীতে মশার অস্তিত্ব রয়েছে। অর্থাৎ, এদের ইতিহাস ১৫ কোটি বছরেরও বেশি পুরোনো হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীর পরিবেশে টিকে থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ ছড়ানোর মাধ্যমে মশা মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
মানুষের সভ্যতা এগিয়েছে, চিকিৎসাবিজ্ঞান উন্নত হয়েছে, রোগ শনাক্ত ও প্রতিরোধের পদ্ধতিও আধুনিক হয়েছে। তবু মশাবাহিত রোগ এখনো বিশ্বের বহু মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে।
আকারে ক্ষুদ্র হলেও মশাকে তাই শুধু বিরক্তিকর পতঙ্গ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মশাবাহিত রোগ থেকে বাঁচতে ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি মশার বংশবিস্তার রোধ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কারণ, এই ক্ষুদ্র পতঙ্গের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রোগই হয়ে উঠতে পারে মানুষের জীবনের জন্য বড় হুমকি।



