২৩ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ৭ কার্তিক ১৪৩৩
জীবনযাপন

আত্মীয়দের অস্বস্তিকর প্রশ্ন, সামলাবেন যেভাবে

relatives

পারিবারিক অনুষ্ঠান, বিয়ে কিংবা দীর্ঘদিন পর আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা—আড্ডার শুরুতেই কখনো কখনো এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, যার উত্তর দিতে স্বস্তি বোধ করেন না অনেকেই। ‘বিয়ে কবে করছ?’, ‘এখনো সন্তান নিচ্ছ না কেন?’, ‘বেতন কত?’ কিংবা ‘ওজন এত বেড়েছে কেন?’—কাছের মানুষের মুখে শোনা এসব প্রশ্ন মুহূর্তেই আনন্দের পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে।

প্রশ্নকর্তার কাছে বিষয়গুলো হয়তো নিছক কৌতূহল কিংবা আলাপ জমানোর উপায়। কিন্তু যাঁকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, তাঁর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, মানসিক অবস্থা কিংবা বাস্তবতার সঙ্গে সেই প্রশ্নের সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষা করাও জরুরি। কৌশলী কিছু কথার মাধ্যমে অপ্রিয় পরিস্থিতি এড়ানো যায়, আবার কাউকে অপমানও করতে হয় না।

সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়

আত্মীয়স্বজনের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করলেও মুখের ওপর কিছু বলতে পারেন না। মনে হয়, উত্তর না দিলে হয়তো তাঁরা কষ্ট পাবেন কিংবা অসৌজন্য মনে করবেন। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠই হোক, ব্যক্তিগত জীবনের সব তথ্য সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। বিয়ে, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা, আয়, চাকরি কিংবা সম্পর্কের মতো বিষয় নিয়ে কতটুকু কথা বলবেন, তা একান্তই আপনার সিদ্ধান্ত। কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে সংক্ষেপে বলতে পারেন, ‘এখনো কিছু ঠিক করিনি’, ‘সময় হলে জানাব’ কিংবা ‘বিষয়টি আপাতত নিজের মধ্যেই রাখতে চাই।’

অতিরিক্ত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অনেক সময় কথোপকথন আরও দীর্ঘ হয় এবং নতুন প্রশ্নের সুযোগ তৈরি হয়। তাই নিজের অবস্থান সংক্ষেপে জানিয়ে দেওয়াই ভালো।

হাসিমুখে প্রসঙ্গ বদলে দিন

Advertisements

সব প্রশ্নের জবাবে কঠোরভাবে সীমা নির্ধারণের প্রয়োজন নেই। অনেক সময় হালকা রসিকতা কিংবা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েই পরিস্থিতি সামলে নেওয়া যায়।

কেউ যদি জানতে চান, ‘বিয়ে কবে করছ?’ তাহলে হাসিমুখে বলতে পারেন, ‘ঠিক হলে আপনাদের দাওয়াত দিতে ভুলব না!’ এরপর তাঁর খোঁজখবর নেওয়া কিংবা অন্য কোনো প্রসঙ্গ তোলার মাধ্যমে কথোপকথনের দিক পরিবর্তন করতে পারেন। চাকরি বা বেতন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে অন্য বিষয়ে কথা শুরু করা সম্ভব। এতে সরাসরি বিরোধে না জড়িয়েও বোঝানো যায় যে নির্দিষ্ট বিষয়টি নিয়ে আপনি দীর্ঘ আলোচনা করতে আগ্রহী নন।

তবে মনে রাখতে হবে, রসিকতা তখনই কার্যকর, যখন সেটি আপনার নিজের কাছে স্বস্তিদায়ক। অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে জোর করে হাসিমুখে সবকিছু মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

বারবার প্রশ্ন করলে স্পষ্টভাবে বলুন

কেউ একবার প্রশ্ন করার পর প্রসঙ্গ বদলে দেওয়া গেলেও কিছু মানুষ একই বিষয় বারবার জানতে চান। বিশেষ করে বিয়ে, সন্তান কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তাঁদের কৌতূহল সহজে শেষ হতে চায় না। এমন পরিস্থিতিতে ভদ্রতা বজায় রেখেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বলতে পারেন, ‘এই বিষয়টি নিয়ে এখন কথা বলতে চাইছি না’ অথবা ‘এটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়, তাই বিস্তারিত বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি না।’

কথাগুলো বলার সময় কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখুন। অপ্রয়োজনীয় তর্কে না গিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে স্থির থাকুন। কেউ একই প্রশ্ন বারবার করলে প্রতিবার নতুন করে ব্যাখ্যা দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। আগের উত্তরটিই শান্তভাবে পুনরাবৃত্তি করতে পারেন। নিজের ব্যক্তিগত সীমা নির্ধারণ করা মানে সম্পর্ক নষ্ট করা নয়। বরং পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার জন্য কখনো কখনো স্পষ্টভাবে কথা বলা প্রয়োজন।

চেহারা বা ওজন নিয়ে মন্তব্যের জবাব দিন নিজের মতো

আত্মীয়দের আড্ডায় ব্যক্তিগত প্রশ্নের পাশাপাশি চেহারা, বয়স, পোশাক কিংবা ওজন নিয়ে মন্তব্যও প্রায়ই শোনা যায়। ‘অনেক মোটা হয়ে গেছ’, ‘এত শুকিয়ে গেলে কেন?’ কিংবা ‘বয়স তো কম হলো না’—এ ধরনের কথা অনেকের আত্মবিশ্বাসে আঘাত করতে পারে।

এমন মন্তব্য শুনলে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানান। খুব বেশি গুরুত্ব দিতে না চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারেন। তবে মন্তব্যটি অস্বস্তিকর হলে সরাসরি জানানোও ঠিক আছে। যেমন, ‘আমার ওজন নিয়ে আলোচনা না করলেই ভালো লাগবে’ কিংবা ‘চেহারা নিয়ে মন্তব্য শুনলে আমি অস্বস্তি বোধ করি।’ কেউ মজা করার উদ্দেশ্যে মন্তব্য করলেও সেটি আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য হতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে কাউকে অপমান করার প্রয়োজন নেই; আবার অন্যকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজের অস্বস্তি চেপে রাখাও জরুরি নয়।

প্রশ্নের পেছনের উদ্দেশ্য বুঝুন, তবে নিজের স্বস্তিকে গুরুত্ব দিন

সব অস্বস্তিকর প্রশ্নের পেছনে খারাপ উদ্দেশ্য থাকে না। কেউ হয়তো সত্যিই আপনার খোঁজখবর নিতে চান, আবার কেউ অভ্যাসবশত এমন প্রশ্ন করেন। তাই প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্নকর্তার উদ্দেশ্য ভালো হলেই প্রশ্নটি আপনার কাছে স্বস্তিদায়ক হবে, এমন নয়। কেউ স্নেহ থেকে জানতে চাইলেও আপনি চাইলে উত্তর না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। প্রয়োজনে বলতে পারেন, ‘আপনি আমার খোঁজ নিচ্ছেন, সেটা ভালো লাগছে। তবে এই বিষয়টি নিয়ে এখন কথা বলতে চাই না।’ এভাবে নিজের অনুভূতি জানালে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা কমতে পারে এবং সম্পর্কের উষ্ণতাও বজায় থাকে।

নিজের মানসিক স্বস্তিকে অগ্রাধিকার দিন

পারিবারিক অনুষ্ঠানে সবার সঙ্গে হাসিমুখে মিশতে গিয়ে নিজের অস্বস্তিকে উপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। কোনো কথোপকথন বেশি বিরক্তিকর হয়ে উঠলে সেখান থেকে সরে গিয়ে অন্য কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেন, একটু বিরতি নিতে পারেন কিংবা প্রয়োজন হলে অনুষ্ঠানের অন্য কাজে মন দিতে পারেন।

একইসঙ্গে অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও প্রশ্ন করার আগে একটু ভাবা ভালো। যে প্রশ্নটি আপনার কাছে সাধারণ মনে হচ্ছে, সেটিই অন্য কারও জীবনের সংবেদনশীল কোনো বিষয় হতে পারে।

মনে রাখবেন, ভদ্রতা মানে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয়। নিজের সীমা বোঝানো, প্রয়োজন হলে ‘না’ বলা এবং ব্যক্তিগত বিষয় নিজের কাছে রাখার অধিকার সবারই আছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক সুন্দর রাখতে যেমন আন্তরিকতা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন একে অপরের ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান।

Advertisements