২৩ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ৭ কার্তিক ১৪৩৩
নারী

চল্লিশে বাঁচুন প্রাণখুলে, নিজের শর্তে

pleased-casual-caucasian-middle-aged-woman-putting-hands-shirt-collar_141793-80822

চল্লিশ মানেই বয়সের ভারে নুয়ে পড়া নয়, বরং নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের এক দারুণ সময়। জীবনের চার দশক পেরিয়ে আপনি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ, আত্মবিশ্বাসী ও পরিণত। কে কী বলল, কে কী ভাবল—এসব নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনার দিন পেরিয়ে এবার নিজের পছন্দ, আনন্দ ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়ার পালা। এত দিনে জীবনের নানা চড়াই-উতরাই দেখেছেন, সম্পর্কের টানাপোড়েন সামলেছেন, দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার নিজের জন্যও একটু বাঁচুন। চল্লিশের নতুন বসন্তে নিজেকে দিন নতুন কিছু প্রতিশ্রুতি।

শান্ত থাকুন, সিদ্ধান্তে অটল থাকুন

জীবনের চল্লিশটি বসন্ত আপনাকে নিশ্চয়ই অনেক কিছু শিখিয়েছে। কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়, কাকে বিশ্বাস করা যায়, কোথায় থামতে হয়—এসব অভিজ্ঞতা এখন আপনার বড় সম্পদ। তাই আবেগের বশে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরিস্থিতি বুঝে এগিয়ে চলুন। অন্যের মতামত শুনুন, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী থাকুন। সবাইকে খুশি করতে গিয়ে নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মনে রাখবেন, পরিণত হওয়ার অর্থ সব সময় গম্ভীর থাকা নয়; বরং কখন কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে, তা বুঝতে পারা।

নিজের ইচ্ছার তালিকা তৈরি করুন

এত দিন হয়তো সংসার, সন্তান, চাকরি কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রয়োজন মেটাতেই ব্যস্ত ছিলেন। এবার নিজের ইচ্ছাগুলোর দিকে তাকান। কোথাও ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্ন আছে? নতুন কোনো কোর্স করতে চান? কিংবা দীর্ঘদিন ধরে নিজের পছন্দের একটি পোশাক কেনার কথা ভাবছেন? সবকিছু লিখে ফেলুন একটি তালিকায়।

যাঁরা বিয়ে করার পরিকল্পনা করছেন, তাঁরা নিজের পছন্দ ও সামর্থ্য অনুযায়ী আয়োজনের পরিকল্পনা করতে পারেন। আর যাঁরা একা রয়েছেন, তাঁরা নিজের মতো করে ভ্রমণ, নতুন শখ কিংবা অবসর কাটানোর পরিকল্পনা সাজিয়ে নিতে পারেন। পোশাকের ধরন, চুলের ছাঁট কিংবা সাজের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন নিজের রুচি অনুযায়ী। বয়সের সঙ্গে মানিয়ে চলার নামে নিজের পছন্দকে ছোট করে দেখবেন না।

Advertisements

নিজের আনন্দের জন্যও রাখুন বাজেট

সঞ্চয়, সংসারের খরচ, বিনিয়োগ কিংবা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য অর্থ জমাতে গিয়ে নিজের শখের কথা ভুলে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের আনন্দের জন্যও নির্দিষ্ট অর্থ রাখা জরুরি। সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট একটি বাজেট তৈরি করুন, যা দিয়ে নিজের পছন্দের কিছু করতে পারবেন।

সেটি হতে পারে একটি বই কেনা, ছবি আঁকা শেখা, বেকিংয়ের ক্লাস করা কিংবা ঘরের জন্য পছন্দের কোনো শিল্পকর্ম সংগ্রহ করা। শখ পূরণের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতেই হবে, এমন নয়। বরং পরিকল্পিতভাবে অল্প অল্প করে নিজের আনন্দের জায়গা তৈরি করুন।

একই সঙ্গে ‘লোকে কী বলবে’—এই ভয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করুন। কোনো কাজ করতে ইচ্ছা হলে এবং তা বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ হলে চেষ্টা করে দেখুন। প্রত্যাখ্যান কিংবা ব্যর্থতা জীবনেরই অংশ। সব চেষ্টায় সফল হওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু চেষ্টা না করলে নতুন অভিজ্ঞতাও অর্জিত হয় না।

সম্পর্কের সংখ্যা নয়, গভীরতাকে গুরুত্ব দিন

চল্লিশে পৌঁছে অনেকেই উপলব্ধি করেন, আগের মতো সব বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সংসারে, কেউ কর্মজীবনে, আবার কেউ দূরে সরে গেছেন সময়ের ব্যবধানে। এ নিয়ে মন খারাপ করার প্রয়োজন নেই। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সব সম্পর্ক একই রকম থাকে না।

বরং যাঁরা এখনো আপনার পাশে রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে সময় কাটান। পুরোনো বন্ধুকে ফোন করুন, একসঙ্গে কফি পান করুন, কেনাকাটা করতে যান কিংবা ছোট্ট কোনো ভ্রমণের পরিকল্পনা করুন। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও তৈরি করুন। নিজের সামাজিক পরিসর ছোট হয়ে এসেছে বলে নিজেকে ব্যর্থ ভাববেন না। অল্প কয়েকজন মানুষের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্কও জীবনে অনেক আনন্দ এনে দিতে পারে।

ত্বকের যত্নে হোক মনোযোগ, বয়স নিয়ে নয়

চল্লিশে এসে ত্বকে সূক্ষ্ম রেখা, বলিরেখা কিংবা রোদে তৈরি হওয়া ছোট ছোট দাগ দেখা দিতে পারে। এগুলো বয়স বাড়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। তাই প্রতিটি রেখা ঢেকে রাখার জন্য অতিরিক্ত মেকআপের ওপর নির্ভর না করে ত্বক সুস্থ রাখার দিকে মন দিন। নিয়মিত মৃদু ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন, ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন এবং দিনের বেলায় এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন লাগান। ত্বকের ধরন অনুযায়ী পণ্য বেছে নিন। নতুন কোনো উপাদান ব্যবহারের আগে ত্বকে তার প্রতিক্রিয়া খেয়াল করুন।

প্রাকৃতিক বয়সের ছাপ মুছে ফেলতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মেকআপ করতে ভালো লাগলে করুন, আবার মেকআপ ছাড়াও স্বচ্ছন্দ থাকুন। নিজের চেহারা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শরীরের যত্নে অবহেলা নয়

চল্লিশের পর সুস্থ থাকতে জীবনযাপনের অভ্যাসের দিকে বাড়তি মনোযোগ দেওয়া ভালো। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য ও উপযুক্ত প্রোটিন রাখুন। অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত করুন। নিয়মিত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কিংবা পছন্দের অন্য কোনো শারীরিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকুন। সপ্তাহজুড়ে নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি পেশির শক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও উপকারী। পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ সামলানো এবং ধূমপান এড়িয়ে চলার অভ্যাসও সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ বা কিডনির অসুখের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসককে তা জানান। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কখন করাতে হবে, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সবার জন্য একই ধরনের বার্ষিক পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না; আপনার জন্য কোন পরীক্ষা উপযুক্ত, তা চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।

পরিবারকে সময় দিন, নিজের জন্যও রাখুন সময়

চল্লিশে এসে অনেকেই একই সঙ্গে একাধিক দায়িত্ব পালন করেন। একদিকে সন্তানদের দেখাশোনা, অন্যদিকে বয়স্ক মা-বাবার খোঁজখবর, তার সঙ্গে চাকরি কিংবা সংসারের নানা কাজ। ফলে নিজের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবু মনে রাখুন, পরিবারের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি নিজের বিশ্রাম ও আনন্দও প্রয়োজন। সন্তানদের সঙ্গে গল্প করুন, মা-বাবার পাশে বসুন, পরিবারের সবাইকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যান। একই সঙ্গে নিজের পছন্দের কাজ করার জন্যও কিছু সময় রাখুন। সব দায়িত্ব একা সামলানোর চেষ্টা না করে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কাজ ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

বয়সের সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চার থেমে থাকে না

অনেকেরই একটি বাকেট লিস্ট থাকে, যেখানে জমে থাকে নানা স্বপ্ন—পাহাড়ে ট্রেকিং, সমুদ্রের ধারে একা সময় কাটানো, নতুন কোনো শহর ঘুরে দেখা কিংবা স্কাইডাইভিংয়ের মতো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ব্যস্ততার কারণে এত দিন হয়তো সেগুলো করা হয়নি। এবার তালিকাটি আবার খুলে বসুন। সামর্থ্য ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী পরিকল্পনা করুন। বন্ধুদের সঙ্গে ভ্রমণে যান, নতুন কোনো জায়গা ঘুরে দেখুন কিংবা একা বেরিয়ে পড়ুন নিজের পছন্দের গন্তব্যে। রোমাঞ্চকর কোনো কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে চাইলে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যগত উপযোগিতা নিশ্চিত করুন। দূরে কোথাও যাওয়ার সময় না পেলে কাছের কোনো ক্যাফেতে বসে বই পড়া কিংবা প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে আড্ডাও হতে পারে আনন্দের উপলক্ষ। নতুন অভিজ্ঞতা মানেই বড় কোনো আয়োজন নয়। প্রতিদিনের একঘেয়েমি ভেঙে ছোট্ট পরিবর্তনও মনকে সতেজ করতে পারে।

নিজের সাফল্য উদ্‌যাপন করুন

আমরা প্রায়ই অন্যের স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকি। অফিসে প্রশংসা পেলাম কি না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টে কতজন প্রতিক্রিয়া জানালেন কিংবা আত্মীয়রা আমাদের জীবন নিয়ে কী ভাবছেন—এসবের ওপর নির্ভর করে কখনো কখনো নিজের সাফল্যের মূল্য নির্ধারণ করি। চল্লিশে এসে এই অভ্যাস বদলানোর চেষ্টা করুন। কঠিন একটি সময় পার করেছেন? নিজের কাজের পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব সামলেছেন? বহু দিনের কোনো লক্ষ্য পূরণ করেছেন? তাহলে নিজেকে অভিনন্দন জানান। নিজের জন্য পছন্দের খাবার তৈরি করুন, বাইরে খেতে যান, একটি বই কিনুন কিংবা ছুটির দিনে প্রিয় কাজটি করুন।

অন্যের প্রশংসা ভালো লাগতেই পারে, কিন্তু নিজের পরিশ্রমের মূল্য বুঝতে অন্যের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। নিজের অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দেওয়াও আত্মযত্নের অংশ।

চল্লিশ মানেই নতুন করে শুরু করার সুযোগ

জীবনের চার দশক পেরিয়ে আসা মানে সব স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেছে, এমন নয়। বরং এই বয়সে আপনি নিজের পছন্দ-অপছন্দ, সীমাবদ্ধতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তাই নতুন কিছু শেখা, পুরোনো কোনো স্বপ্নকে আবার গুরুত্ব দেওয়া কিংবা জীবনের অপ্রয়োজনীয় চাপ কমানোর জন্য এটি হতে পারে উপযুক্ত সময়।

অন্যের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা না করে নিজের অগ্রগতির দিকে তাকান। কোথায় পৌঁছাতে পারেননি, তার হিসাবের পাশাপাশি কতটা পথ পেরিয়ে এসেছেন, সেটিও মনে রাখুন।

চল্লিশ কোনো সমাপ্তি নয়, বরং নিজেকে নতুনভাবে চেনার আরেকটি অধ্যায়। তাই বয়স নিয়ে সংকোচ নয়, অভিজ্ঞতা নিয়ে গর্ব করুন। দায়িত্ব পালন করুন, সম্পর্ক আগলে রাখুন, শরীর ও মনের যত্ন নিন—আর সবকিছুর মাঝেও নিজের জন্য বাঁচতে ভুলবেন না।

Advertisements