রোমান্টিক হিপোক্রেসি: নিজের ভুল আড়াল করে সঙ্গীকে দোষারোপ

প্রেমের সম্পর্কে সঙ্গী অন্য কারও সঙ্গে নিয়মিত ব্যক্তিগত বার্তা বিনিময় করছেন। বিষয়টি আপনার অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। আপনার মনে হতে পারে, এমন আচরণ সম্পর্কের বিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী। অথচ আপনি নিজে যখন অন্য কারও সঙ্গে একইভাবে কথা বলেন, তখন হয়তো বিষয়টিকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করেন—‘আমরা শুধুই বন্ধু’ কিংবা ‘এতে আপত্তির কী আছে?’
সম্পর্কে নিজের ও সঙ্গীর আচরণ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এমন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় দেখা যায়। যে কাজটি প্রিয় মানুষটি করলে বিশ্বাসভঙ্গ বলে মনে হয়, নিজের বেলায় সেটিকেই নির্দোষ বলে বিবেচনা করা হয়। মনোবিজ্ঞানে এই ধরনের দ্বৈত মানসিকতাকে বলা হয় ‘রোমান্টিক হিপোক্রেসি’ বা প্রেমের সম্পর্কে ভণ্ডামি।
সম্পর্কে বিশ্বস্ততার অর্থ সবার কাছে এক নয়। শারীরিক ঘনিষ্ঠতার বাইরেও আবেগনির্ভর যোগাযোগ, অন্য কারও সঙ্গে গোপনে কথা বলা, ডেটিং অ্যাপে সক্রিয় থাকা কিংবা তৃতীয় কোনও ব্যক্তির প্রতি রোমান্টিক আগ্রহ প্রকাশ—এসব বিষয়কে কেউ বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে দেখতে পারেন। আবার অন্য কারও কাছে এগুলো ততটা গুরুতর নাও মনে হতে পারে। ফলে সম্পর্কে কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য আর কোনটি সীমা অতিক্রম করে, তা নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তবে জটিলতা বাড়ে তখনই, যখন নিজের আচরণের পক্ষে যুক্তি দেখানো হয়, অথচ সঙ্গী একই কাজ করলে তার প্রতি কঠোর মনোভাব নেওয়া হয়। অর্থাৎ, আচরণটি একই হলেও সেটি কে করছেন, তার ওপর নির্ভর করে বিচার করার ধরন বদলে যায়।
নিজের বেলায় কেন ভুলটা কম গুরুতর মনে হয়?
মনোবিদ অ্যাশলি ই. থম্পসন ও লুসিয়া এফ. ও’সুলিভানের পরিচালিত একটি গবেষণায় ৮১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের অভিজ্ঞতা ও মতামত বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গবেষণাটির শিরোনাম ছিল ‘আমি পারি, কিন্তু তুমি পারো না’।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সম্পর্কের বিভিন্ন আচরণকে তাঁরা কতটা অবিশ্বস্ততা বা প্রতারণা হিসেবে দেখেন এবং নিজেরা কখনো এমন আচরণ করেছেন কি না।
ফলাফলে দেখা যায়, আবেগঘন ও স্নেহপূর্ণ আচরণ এবং প্রযুক্তি বা অনলাইন মাধ্যমে যোগাযোগের মতো কিছু ক্ষেত্রে মানুষ নিজের আচরণকে সঙ্গীর আচরণের তুলনায় বেশি নমনীয়ভাবে মূল্যায়ন করেন। অর্থাৎ, নিজেরা এমন কিছু করলে সেটিকে কম গুরুতর মনে হলেও সঙ্গী একই কাজ করলে তাঁদের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক কঠোর হতে পারে।
তবে গবেষণায় সব ধরনের আচরণের ক্ষেত্রে একই পার্থক্য পাওয়া যায়নি। যৌন আচরণসহ কিছু ব্যক্তিগত আচরণ মূল্যায়নের সময় নিজের ও সঙ্গীর মধ্যে একই ধরনের দ্বৈত মানদণ্ড দেখা যায়নি।
এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, সম্পর্কের কোনও আচরণকে প্রতারণা হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে শুধু কাজটির ধরনই নয়, কাজটি কে করছেন, সেটিও মানুষের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।
নিজের আচরণের পক্ষে অজুহাত খোঁজার প্রবণতা
নিজের ভুলকে তুলনামূলক ছোট করে দেখার পেছনে মানুষের চিন্তাভাবনার একটি বিশেষ ধরন ভূমিকা রাখতে পারে। অন্য কেউ কোনও কাজ করলে আমরা অনেক সময় তাঁর ব্যক্তিত্ব, উদ্দেশ্য কিংবা মানসিকতাকে সেই আচরণের কারণ হিসেবে দেখি। কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে একই কাজের ব্যাখ্যা খুঁজি পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সঙ্গী অন্য কারও সঙ্গে গোপনে ঘনিষ্ঠভাবে কথা বললে মনে হতে পারে, তিনি জেনেশুনেই সম্পর্কের সীমা লঙ্ঘন করছেন। অথচ নিজে একই কাজ করলে ব্যাখ্যা আসতে পারে, ‘সেদিন মনটা ভালো ছিল না’, ‘কথা বলতে বলতে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে’ অথবা ‘এখানে অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল না’।
মনোবিজ্ঞানে নিজের আচরণ ও অন্যের আচরণ ব্যাখ্যা করার এই পার্থক্যের সঙ্গে ‘অ্যাক্টর-অবজারভার বায়াস’ বা কর্তা-পর্যবেক্ষক পক্ষপাতের সম্পর্ক রয়েছে। নিজের কাজের ক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও অন্যের কাজের পেছনে তাঁর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বা উদ্দেশ্যকে দায়ী করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের চিন্তাভাবনা নিজের কাছে নিজের ভাবমূর্তি ভালো রাখার সুযোগ তৈরি করে। মানুষ নিজের আচরণের জন্য যুক্তি খুঁজে পায় এবং নিজেকে ভুলের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করতে পারে। কিন্তু এর ফলে সঙ্গীর অনুভূতি, কষ্ট কিংবা অভিযোগকে গুরুত্ব না দেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এমন মনোভাব সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব ও অবিশ্বাস বাড়াতে পারে।
বিশ্বাসভঙ্গের সংজ্ঞা কি সবার জন্য এক?
প্রতিটি সম্পর্কের নিয়ম, প্রত্যাশা ও সীমারেখা আলাদা হতে পারে। কারও কাছে অন্য কারও সঙ্গে গোপনে বার্তা বিনিময় করাই বিশ্বাসভঙ্গের শামিল। আবার কেউ মনে করতে পারেন, শারীরিক ঘনিষ্ঠতা না থাকলে এমন যোগাযোগকে প্রতারণা বলা যায় না।
একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য কারও সঙ্গে ফ্লার্ট করা, সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা কিংবা নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার বিষয়েও সম্পর্কে থাকা দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে।
তাই কোনও একটি আচরণকে সব সম্পর্কের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুজন মানুষ তাঁদের সম্পর্কের সীমা ও প্রত্যাশা সম্পর্কে কতটা পরিষ্কার ধারণা রাখেন। এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা না হলে ছোটখাটো মতপার্থক্য থেকেও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে।
তবে প্রত্যাশার অমিল আর দ্বৈত মানদণ্ড এক বিষয় নয়। দুজনের মত আলাদা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের জন্য যে স্বাধীনতা বা ছাড় প্রত্যাশা করা হচ্ছে, সঙ্গীর ক্ষেত্রে একই সুযোগ দিতে অস্বীকার করলে সম্পর্কের পারস্পরিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সুস্থ সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক বোঝাপড়া
সম্পর্কে বিশ্বস্ততা নিয়ে আলোচনা করা উচিত কোনও বড় সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই। কোন আচরণে একজন অস্বস্তি বোধ করেন, কোন বিষয়টি ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে এবং কোন পর্যায়ে তা বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—এসব বিষয়ে দুজনের মধ্যে স্পষ্ট বোঝাপড়া থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নিজের আচরণকে সঙ্গীর দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখার চেষ্টা করা জরুরি। আপনি যে কাজটি সঙ্গী করলে কষ্ট পেতেন, নিজে সেটি করার সময় তাঁর অনুভূতি কেমন হতে পারে, তা ভেবে দেখা দরকার। নিজের উদ্দেশ্য নির্দোষ মনে হলেই যে অন্য ব্যক্তির কষ্ট পাওয়ার কোনও কারণ নেই, বিষয়টি এমন নয়।
এ ক্ষেত্রে খোলামেলা যোগাযোগ, পারস্পরিক সম্মান এবং ভুল হলে তা স্বীকার করার মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিজের আচরণের ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি সঙ্গীর অনুভূতি মনোযোগ দিয়ে শোনাও প্রয়োজন। কোনও বিষয়ে মতের অমিল থাকলে অভিযোগ বা দোষারোপের পরিবর্তে দুজনের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা যেতে পারে।
প্রেমের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শুধু বিশ্বস্ত থাকার প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে দৈনন্দিন আচরণের মিল থাকাও জরুরি। একে অপরের প্রতি যে নিয়ম ও প্রত্যাশা রাখা হচ্ছে, নিজের ক্ষেত্রেও তা সমানভাবে প্রয়োগ করার মানসিকতা সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে পারে।
নিজের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা যেতে পারে—সঙ্গীর যে আচরণকে আপনি অন্যায় বা বিশ্বাসভঙ্গ বলে মনে করছেন, একই পরিস্থিতিতে নিজে পড়লে কি সেটিকে একইভাবে বিচার করবেন? এই প্রশ্নের সৎ উত্তরই সম্পর্কের মধ্যে নিজের অবস্থান ও দ্বৈত মানসিকতা সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করতে পারে।



