২৩ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ৭ কার্তিক ১৪৩৩
ধর্ম

গিবত ও পরনিন্দা: ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়াবহ পরিণতি

images (16)

গিবত ও পরনিন্দা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক সময় সাধারণ আলাপ, বন্ধুমহলের আড্ডা কিংবা অন্যের সমালোচনা করতে গিয়ে মানুষ অজান্তেই এই গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। অথচ ইসলামে গিবতকে গুরুতর পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এটি শুধু মানুষের সম্মানহানি করে না, বরং পরকালে ব্যক্তির জন্য ভয়াবহ পরিণতির কারণও হতে পারে।

ইসলামে গিবতের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে তিনি সাহাবিদের কাছে জানতে চান, গিবত কী। সাহাবিরা উত্তরে বলেন, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। তখন তিনি ব্যাখ্যা করেন, কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, যা সে শুনলে অপছন্দ করবে, সেটিই গিবত। সাহাবিরা জানতে চান, আলোচিত বিষয়টি ওই ব্যক্তির মধ্যে সত্যিই থাকলে সেটিও কি গিবত হবে? রাসুল (সা.) জানান, বিষয়টি তার মধ্যে থাকলে তা গিবত, আর না থাকলে তা হবে অপবাদ।

অর্থাৎ, কারও বাস্তব দোষ বা দুর্বলতা তার অনুপস্থিতিতে এমনভাবে তুলে ধরা, যা তার কাছে অসম্মানজনক বা কষ্টদায়ক, তা গিবতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। অন্যদিকে, কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো বা তার মধ্যে নেই এমন দোষ আরোপ করাকে অপবাদ বলা হয়। এ ধরনের কাজ মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং সমাজে অবিশ্বাস ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে।

পবিত্র কোরআনের সুরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের অধিকাংশ সন্দেহ থেকে দূরে থাকতে, অন্যের গোপন বিষয় অনুসন্ধান না করতে এবং পরস্পরের গিবত না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই আয়াতে গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা মানুষের কাছে অত্যন্ত ঘৃণ্য। এই উপমার মাধ্যমে গিবতের নৈতিক ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে।

ইসলামে শুধু গিবত নয়, চোগলখোরিকেও কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। চোগলখোরি হলো এক ব্যক্তির কথা অন্যের কাছে এমনভাবে পৌঁছে দেওয়া, যার ফলে বিরোধ, শত্রুতা কিংবা সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সহিহ বুখারিতে চোগলখোরির ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। এ ধরনের আচরণ মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়।

গিবত ও পরনিন্দার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, এর মাধ্যমে মানুষের নেক আমল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, অন্যের সম্মানহানি ও অধিকার নষ্ট করার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অনুশোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকারও জড়িত। তাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি মানুষের হক নষ্ট করার বিষয়টি যথাসম্ভব সংশোধন করা প্রয়োজন।

Advertisements

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রকৃত দেউলিয়া ব্যক্তির পরিচয় দিয়েছেন। কিয়ামতের দিন কেউ নামাজ, রোজা ও জাকাতসহ বহু নেক আমল নিয়ে উপস্থিত হলেও যদি সে অন্যকে গালি দিয়ে থাকে, কারও বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়ে থাকে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করে থাকে কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করে থাকে, তাহলে তার নেকি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের পাপ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। এই হাদিস মানুষের অধিকার রক্ষার গুরুত্ব এবং জিহ্বার অপব্যবহারের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে।

সহিহ বুখারিতে আরও একটি হাদিসে দুই কবরের আজাবের কথা বর্ণিত হয়েছে। সেখানে একজনের প্রস্রাব থেকে পবিত্র থাকার ব্যাপারে অসতর্কতা এবং অন্যজনের চোগলখোরির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, মানুষের কাছে ছোট মনে হওয়া কিছু আচরণও ধর্মীয় দৃষ্টিতে গুরুতর হতে পারে।

তবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কারও সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য প্রকাশ করা এবং অকারণে তার দোষ প্রচার করা এক বিষয় নয়। ইসলামি পণ্ডিতেরা নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ন্যায়সংগত উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানোর অনুমতি দিয়েছেন। ইমাম নববি (রহ.) এ বিষয়ে কয়েকটি ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ করেছেন।

প্রথমত, কেউ জুলুমের শিকার হলে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য বিচারক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন। দ্বিতীয়ত, কোনো অন্যায় বন্ধ করা বা তার প্রতিকার পাওয়ার উদ্দেশ্যে দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে ঘটনার বিবরণ দেওয়া যেতে পারে। তৃতীয়ত, ধর্মীয় বিধান জানতে মুফতির কাছে নিজের সমস্যার কথা বলা বৈধ। চতুর্থত, কাউকে প্রতারণা বা ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক তথ্য জানানো যেতে পারে। যেমন, কোনো ব্যবসায়ীর প্রতারণার বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক সতর্কতা দেওয়া কিংবা বিয়ের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে গুরুতর প্রাসঙ্গিক তথ্য জানানো। পঞ্চমত, কেউ প্রকাশ্যে অন্যায় করলে তার প্রকাশ্য কাজ সম্পর্কে প্রয়োজনের সীমার মধ্যে আলোচনা করা যেতে পারে। ষষ্ঠত, কাউকে শনাক্ত করার জন্য কোনো পরিচিত বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা যেতে পারে, যদি উদ্দেশ্য অপমান করা না হয়।

এসব ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হতে হবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, ক্ষতি প্রতিরোধ কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, অপমান বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে কারও দোষ ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব ব্যতিক্রম ব্যবহার করা উচিত নয়।

গিবত থেকে বাঁচতে প্রথমেই নিজের কথা ও আচরণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে আলোচনা করার আগে ভাবতে হবে, কথাটি সত্য হলেও তা বলা প্রয়োজন কি না এবং এতে অন্যায়ভাবে তার সম্মানহানি হচ্ছে কি না। মনে রাখতে হবে, মানুষের মুখের কথা অন্যের কাছে গোপন থাকলেও আল্লাহর কাছে তা গোপন নয়।

কারও ভুল চোখে পড়লে তা নিয়ে অন্যের সঙ্গে আলোচনা না করে উপযুক্ত পরিবেশে ব্যক্তিগতভাবে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা ভালো। এতে তার সম্মান রক্ষা পায় এবং সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়। কোনো আড্ডায় গিবত শুরু হলে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করা, আলোচনাটির অন্যায় দিকটি ভদ্রভাবে তুলে ধরা কিংবা প্রয়োজন হলে সেই পরিবেশ থেকে সরে আসাও কার্যকর উপায়।

পাশাপাশি জিকির, কোরআন তিলাওয়াত এবং উপকারী কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখলে অনর্থক আলোচনা থেকে দূরে থাকা সহজ হয়। নিজের কথাবার্তার হিসাব নেওয়ার অভ্যাসও গড়ে তোলা জরুরি। কখন, কেন এবং কী উদ্দেশ্যে অন্যের সম্পর্কে কথা বলছি, তা নিয়ে সচেতন থাকলে জিহ্বার অপব্যবহার কমানো সম্ভব।

কেউ গিবত করে ফেললে তার উচিত আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে এ কাজ থেকে বিরত থাকার সংকল্প করা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার ক্ষুণ্ন হয়ে থাকলে তা সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। তার কাছে সরাসরি ক্ষমা চাওয়া উপযুক্ত কি না, সেটিও পরিস্থিতি বিবেচনা করে নির্ধারণ করা উচিত। ক্ষমা চাইলে যদি নতুন করে বড় ধরনের বিরোধ বা ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে করণীয় সম্পর্কে বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ওই ব্যক্তির জন্য দোয়া করা এবং আগে ছড়ানো অন্যায় কথার প্রভাব দূর করার চেষ্টা করা উচিত।

মানুষের জিহ্বা ছোট হলেও এর মাধ্যমে যেমন ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও শান্তি ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তেমনি অপমান, বিদ্বেষ ও সম্পর্কের ভাঙনও তৈরি হতে পারে। তাই কথা বলার আগে বিবেচনা করা, অন্যের সম্মান রক্ষা করা এবং অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেকের দায়িত্ব। ইসলাম আমাদের শুধু নিজের ইবাদত ঠিক রাখতেই নয়, অন্য মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার প্রতিও যত্নবান হতে শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে গিবত, পরনিন্দা, অপবাদ ও চোগলখোরি থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Advertisements