২১ অক্টোবর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ৫ কার্তিক ১৪৩৩
ধর্ম

বাবা-মায়ের গুনাহের দায় কি সন্তানের ওপর বর্তায়? ইসলাম কী বলে

muslim-parenting_20231109_195229

একজন মানুষের জীবনে বাবা-মায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তাদের ভালোবাসা, ত্যাগ ও স্নেহ সন্তানের বেড়ে ওঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইসলামও বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, তাদের সঙ্গে সদাচরণ করা এবং তাদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তবে বাবা-মা মানুষ হিসেবে ভুল করতে পারেন। কখনো ধর্মীয় বিধান পালনে অবহেলা, কখনো অন্যের প্রতি অন্যায় কিংবা কোনো বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্ত তাদের দ্বারাও হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের করণীয় কী? বাবা-মায়ের ভুল দেখেও কি নীরব থাকতে হবে, নাকি তাদের সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত? আর বাবা-মা কোনো গুনাহ করলে সেই অপরাধের দায় কি তাদের সন্তানকেও বহন করতে হবে?

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষ নিজের কাজের জন্য দায়বদ্ধ। বাবা-মায়ের গুনাহের দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্তানের ওপর বর্তায় না। তবে বাবা-মায়ের ভুল চোখে পড়লে তাদের প্রতি অসম্মান না করে বিচক্ষণতা, ধৈর্য ও কোমল ভাষায় সঠিক বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা সন্তানের দায়িত্বের অংশ।

বাবা-মায়ের ভুল ধরিয়ে দিতে হবে সম্মানের সঙ্গে

ইসলামে বাবা-মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, তাদের অপমান করা কিংবা রূঢ় ভাষায় কথা বলার অনুমতি নেই। তারা কোনো ভুল করলেও সন্তানের উচিত তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় সম্মান ও ভদ্রতা বজায় রাখা। ভুল সংশোধনের উদ্দেশ্য যেন তাদের ছোট করা না হয়; বরং ভালোবাসা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সঠিক পথটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বাবা-মায়ের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা আল-ইসরার ২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, বাবা-মায়ের একজন বা উভয়ে বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের বিরক্তিসূচক কথাও বলা যাবে না। তাদের ধমক না দিয়ে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে হবে।

Advertisements

এই নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, বাবা-মায়ের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে ভাষা ও ব্যবহারের গুরুত্ব অনেক। তাদের কোনো সিদ্ধান্ত বা কাজ ভুল মনে হলেও রাগ দেখানো, অপমান করা কিংবা সবার সামনে বিব্রত করা সমাধানের উপযুক্ত পদ্ধতি নয়।

হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা

বাবা-মাকে ভুল থেকে ফেরানোর ক্ষেত্রে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর আচরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তার বাবা মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিলেন। ইবরাহিম (আ.) তাকে এ পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কথা বলার সময় শ্রদ্ধা ও কোমলতা বজায় রেখেছিলেন।

পবিত্র কোরআনের সুরা মারইয়ামের ৪২ নম্বর আয়াতে তার বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তিনি বাবাকে সম্বোধন করেন, ‘হে আমার পিতা!’ এরপর এমন কিছুর ইবাদত করার বিষয়ে প্রশ্ন করেন, যা শুনতে পারে না, দেখতে পারে না এবং কোনো উপকারও করতে পারে না।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, কারও ভুল সংশোধনের চেষ্টা করার সময় সত্য তুলে ধরার পাশাপাশি ভাষার সৌন্দর্য ও সম্মান বজায় রাখা প্রয়োজন। বাবা-মায়ের সঙ্গে মতের অমিল হলেও তাদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।

ভুল ধরিয়ে দেওয়ার আগে যা খেয়াল রাখা জরুরি

বাবা-মায়ের কোনো আচরণ নিজের অপছন্দ হলেই সেটিকে অন্যায় বা গুনাহ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কোনো বিষয়ে আপত্তি জানানোর আগে নিশ্চিত হতে হবে, সেটি সত্যিই ধর্মীয় বিধান, ন্যায়বিচার কিংবা যুক্তির পরিপন্থী কি না।

বিশেষ করে ধর্মীয় বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যা যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো বিষয়ে আলেমদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য মতভেদ থাকলে নিজের মতামতকেই একমাত্র সঠিক বলে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে, শোনা কথা বা অনুমানের ভিত্তিতে বাবা-মাকে দোষারোপ করাও অনুচিত।

কোনো বিষয় বোঝানোর প্রয়োজন হলে একান্তে ও শান্ত পরিবেশে কথা বলা ভালো। ‘আপনি সব সময় ভুল করেন’—এমন অভিযোগমূলক বক্তব্যের পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘আমি বিষয়টি এভাবে জেনেছি, আপনি কি একটু ভেবে দেখবেন?’ এতে আলোচনার পরিবেশ তুলনামূলক সহজ থাকে এবং ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কাও কমে।

এ ছাড়া সন্তান নিজেও যদি নিজের আচরণে সততা, সংযম ও বিনয় বজায় রাখে, তাহলে তার কথার ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

গুনাহের নির্দেশ দিলে কি বাবা-মায়ের কথা মানতে হবে?

ইসলামে বাবা-মায়ের প্রতি আনুগত্য ও সম্মানের নির্দেশ থাকলেও অন্যায় কিংবা গুনাহের কাজে তাদের নির্দেশ পালন করা বাধ্যতামূলক নয়। যেমন—মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, কারও ওপর জুলুম করা কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করার নির্দেশ দেওয়া হলে তা মানা যাবে না।

তবে অন্যায় নির্দেশ অমান্য করার অর্থ এই নয় যে বাবা-মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা যাবে। তাদের কথা না মানার ক্ষেত্রেও ভদ্রতা, সম্মান ও সদাচরণ বজায় রাখতে হবে।

সুরা লুকমানের ১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, বাবা-মা যদি শিরক করার জন্য চাপ দেন, তবে তাদের সেই নির্দেশ মানা যাবে না; কিন্তু দুনিয়ায় তাঁদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করতে হবে। আয়াতটি অন্যায় নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো আচরণ বজায় রাখার বিষয়টিও স্পষ্ট করে।

অতএব, বাবা-মায়ের কোনো ভুল বা অন্যায় কাজে সায় না দিয়েও তাদের সম্মান করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে রাগ, জোরজবরদস্তি কিংবা অপমানের পরিবর্তে শান্তভাবে নিজের অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা করা উচিত।

বুঝিয়েও কাজ না হলে কী করবেন?

কখনো বাবা-মাকে কোনো বিষয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। বারবার একই কথা বললে যদি বিরক্তি বা পারিবারিক বিরোধ বাড়ে, তাহলে কিছু সময় বিরতি নেওয়া যেতে পারে। পরে উপযুক্ত সময়ে আবার শান্তভাবে বিষয়টি তুলে ধরা যেতে পারে।

পরিবারে এমন কোনো বিচক্ষণ আত্মীয়, প্রবীণ ব্যক্তি কিংবা বিশ্বস্ত আলেম থাকলে, যার কথা বাবা-মা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন, তার সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। অনেক সময় তৃতীয় কোনো ব্যক্তির পরামর্শ পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝি কমাতে সহায়তা করে।

তবে গুরুতর অন্যায়, নিপীড়ন বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে শুধু নীরব থাকা কিংবা বারবার বোঝানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী বিশ্বস্ত ব্যক্তির সহায়তা, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পরামর্শ কিংবা প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নেওয়া জরুরি হতে পারে।

পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলেও ন্যায়বিচার বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান দেখানোর অর্থ অন্য কারও ওপর হওয়া অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। বরং সবার অধিকার রক্ষা এবং যথাসম্ভব শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করাই দায়িত্বশীল আচরণ।

বাবা-মায়ের গুনাহের দায় কি সন্তানের ওপর পড়বে?

ইসলামের মূলনীতি হলো, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের কাজের জন্য জবাবদিহি করবে। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-আনআমের ১৬৪ নম্বর আয়াত এবং সুরা ফাতিরের ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না।

অর্থাৎ বাবা-মা কোনো গুনাহ করলে শুধু তাদের সন্তান হওয়ার কারণে সেই গুনাহের দায় সন্তানের ওপর বর্তাবে না। প্রত্যেকে নিজের আমল ও কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে।

তবে বাবা-মায়ের আচরণ সন্তানের মানসিক অবস্থা, পারিবারিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিজের দায়িত্ব ও আমল ঠিক রাখার পাশাপাশি পরিবারে ভালো পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা যেতে পারে। বাবা-মায়ের ভুল চোখে পড়লে তাদের জন্য দোয়া করা, আন্তরিকভাবে বোঝানো এবং নিজের আচরণে ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গুরুত্বপূর্ণ।

বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব ও নিজের নীতিতে অটল থাকা

ইসলাম বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান ও সদাচরণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে অন্যায় কাজে সহযোগিতা না করা এবং প্রত্যেকের নিজের কাজের জন্য জবাবদিহি করার নীতিও স্পষ্ট করেছে।

তাই বাবা-মায়ের ভুল দেখলে তাদের অপমান করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি তাদের সম্মানের অজুহাতে অন্যায়কে সমর্থন করাও উচিত নয়। প্রয়োজন হলো, সত্যতা যাচাই করে ধৈর্য ও বিনয়ের সঙ্গে নিজের বক্তব্য তুলে ধরা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া।

Advertisements