২০ অক্টোবর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ৪ কার্তিক ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

ডেঙ্গু মোকাবিলায় নতুন আশার নাম মোসনোডেনভির, উদ্যোগ নিতে পারে বাংলাদেশ

IMG_6430

প্রতিবছর ডেঙ্গুর প্রকোপে প্রাণহানি ও হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে বাংলাদেশে। মশা নিধন ও সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এই রোগ মোকাবিলায় কার্যকর ওষুধের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কার্যকর হতে পারে, এমন একটি সম্ভাব্য অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নিয়ে আশার কথা জানিয়েছেন গবেষকেরা। মোসনোডেনভির নামের এই ওষুধের পরবর্তী পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বাংলাদেশে পরিচালনার সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে।

মোসনোডেনভির একটি ছোট অণুর অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ। বেলজিয়ামের কেইউ লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়োহান নেইটসের গবেষণাগারে এটি আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তী সময়ে ওষুধটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের দায়িত্ব নেয় বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসন। প্রতিষ্ঠানটি ওষুধটির প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করলেও পরে এর পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা বন্ধ করে দেয়।

গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডেঙ্গুর চিকিৎসায় ওষুধটির সম্ভাবনা থাকলেও বাণিজ্যিকভাবে পর্যাপ্ত লাভের সম্ভাবনা না থাকায় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো এ ধরনের গবেষণায় আগ্রহ হারাতে পারে। তবে মোসনোডেনভিরের ওপর প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রগুলোর তথ্য আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

গত বছরের শেষ দিকে জনসন অ্যান্ড জনসন ওষুধটি নিয়ে দুটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ প্রকাশ করে। পরে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এও এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রাক্‌-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় মোসনোডেনভির ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কার্যকারিতার সম্ভাবনা দেখিয়েছে। পাশাপাশি প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য বিষাক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিরোধমূলক ব্যবহারের পরীক্ষাতেও ওষুধটির কার্যকারিতার ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ হলো ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ ও ডিইএনভি-৪। অঞ্চল ও সময়ভেদে এগুলোর সংক্রমণের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ডিইএনভি-২ সেরোটাইপের সংক্রমণ বেশি ছিল। অন্যদিকে, আইইডিসিআরের সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় ২০২৬ সালে ডিইএনভি-৩ সেরোটাইপের প্রাধান্যের কথা উঠে এসেছে। ভাইরাসের সেরোটাইপের এই পরিবর্তন ডেঙ্গুর কার্যকর টিকা ও চিকিৎসা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে জাপানের তাকেদা প্রতিষ্ঠানের তৈরি কিউডেঙ্গা টিকা। তবে সব সেরোটাইপের বিরুদ্ধে টিকাটির কার্যকারিতা সমান নয়। অন্যদিকে, ডেঙ্গুর চিকিৎসার জন্য এখনো যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) কিংবা ইউরোপীয় ওষুধ সংস্থার (ইএমএ) অনুমোদিত কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই।

Advertisements

এই পরিস্থিতিতে মোসনোডেনভির নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী। তাঁরা অধ্যাপক ইয়োহান নেইটসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওষুধটির গবেষণাসংক্রান্ত তথ্য ও উপস্থাপনা পর্যালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া গেলে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় ওষুধটির সম্ভাবনা যাচাই করতে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে প্রয়োজন হবে দ্বিতীয় পর্যায়ের বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা ফেস-২বি ট্রায়াল। এটি মূলত রোগীদের ওপর ওষুধটির চিকিৎসাগত কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বাংলাদেশে আইসিডিডিআরবি এ ধরনের ক্লিনিক্যাল গবেষণায় অভিজ্ঞ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এ উদ্যোগে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।

ট্রায়ালে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছে জরুরি ব্যবহারের অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ওষুধটির লাইসেন্সিং, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোও যুক্ত হতে পারে। তবে এ ধরনের অনুমোদন ও উৎপাদনের আগে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট মেধাস্বত্ব ও লাইসেন্সের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের ওষুধশিল্প মূলত জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বেশি পরিচিত। নতুন ওষুধ আবিষ্কার এবং তার ক্লিনিক্যাল উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। তাই মোসনোডেনভির নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ শুধু ডেঙ্গু চিকিৎসার সম্ভাবনাই তৈরি করবে না, বরং দেশের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ওষুধ উন্নয়নের সক্ষমতা যাচাইয়েরও সুযোগ করে দিতে পারে।

তবে গবেষণায় এখন পর্যন্ত পাওয়া ইতিবাচক ফলকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মানুষের শরীরে ওষুধটির কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, উপযুক্ত মাত্রা এবং চিকিৎসার সঠিক সময় নির্ধারণে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। এসব ধাপে সফলতা এলে মোসনোডেনভির ডেঙ্গু মোকাবিলায় নতুন চিকিৎসা বিকল্প হয়ে উঠতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।

Advertisements