১৯ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ৩ কার্তিক ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

সুস্থ থাকতে প্রয়োজন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টিকা, জেনে নিন প্রয়োজনীয় টিকার নাম ও উপকারিতা

62-68edd1647354c-68ef9cfc97402

অনেকের ধারণা, টিকা কেবল শিশুদের জন্যই প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় পরিবর্তন আসে। ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, কিডনির সমস্যা ও ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে। একইভাবে কেমোথেরাপি, কিছু ইমিউনোথেরাপি ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয় এমন ওষুধ গ্রহণকারীদেরও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

কর্মক্ষেত্র, ভ্রমণ, জীবনযাপন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যাকেন্দ্রে বসবাসের কারণেও প্রাপ্তবয়স্করা বিভিন্ন সংক্রামক রোগের সংস্পর্শে আসতে পারেন। এসব রোগ কখনো গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তাই শিশুদের পাশাপাশি বড়দেরও বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ঝুঁকি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া জরুরি। টিকা ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি রোগের বিস্তার কমাতেও ভূমিকা রাখে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি টিকা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

১. ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা

ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা সাধারণত জ্বর, কাশি, গলাব্যথা, সর্দি ও শরীরব্যথার মতো উপসর্গ সৃষ্টি করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া ও অন্যান্য গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে। বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের জন্য ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। ফ্লু ভাইরাসের ধরন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। তাই প্রচলিত ভাইরাসের ধরন বিবেচনায় সাধারণত প্রতিবছর ফ্লুর টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশেষ করে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা নারী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন মানুষ এবং স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের জন্য এই টিকা গুরুত্বপূর্ণ। টিকা নেওয়ার পরও ফ্লু হতে পারে। তবে এটি গুরুতর অসুস্থতা ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। টিকা নেওয়ার পর সামান্য জ্বর, শরীরব্যথা, ক্লান্তি বা ইনজেকশন দেওয়ার স্থানে ব্যথা হতে পারে। সাধারণত এসব উপসর্গ অল্প সময়ের মধ্যেই সেরে যায়।

২. নিউমোকক্কাল বা নিউমোনিয়া প্রতিরোধের টিকা

নিউমোকক্কাল টিকা স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনিয়ে নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এই ব্যাকটেরিয়া নিউমোনিয়ার পাশাপাশি রক্তের সংক্রমণ ও মেনিনজাইটিসের মতো গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে। বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, কিডনির রোগ, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের সমস্যা কিংবা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকার মতো ঝুঁকি রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের জন্য এই টিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই টিকা প্রতিবছর নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে কোন ধরনের টিকা নেওয়া হচ্ছে, আগে টিকা নেওয়া হয়েছে কি না এবং ব্যক্তির বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা কেমন—এসবের ওপর ডোজের সংখ্যা ও সময় নির্ভর করে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নেওয়া উচিত।

Advertisements

৩. হেপাটাইটিস এ ও বি-এর টিকা

হেপাটাইটিস হলো যকৃত বা লিভারের প্রদাহ। হেপাটাইটিস এ ও বি—দুটি ভিন্ন ভাইরাসের কারণে এই রোগ হতে পারে। তবে সংক্রমণের ধরন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এক নয়। হেপাটাইটিস এ সাধারণত দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি অসুস্থতা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, হেপাটাইটিস বি রক্ত ও নির্দিষ্ট শারীরিক তরলের মাধ্যমে ছড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ ঘটাতে পারে। দীর্ঘদিন সংক্রমণ থাকলে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। হেপাটাইটিস বি-এর টিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আগে টিকা না নেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের বয়স, ঝুঁকি ও চিকিৎসাগত অবস্থার ভিত্তিতে এই টিকা দেওয়া যেতে পারে। প্রচলিত তিন ডোজের সূচিতে প্রথম ডোজের এক মাস পর দ্বিতীয় এবং প্রথম ডোজের ছয় মাস পর তৃতীয় ডোজ দেওয়া হয়। তবে টিকার ধরন অনুযায়ী সূচি ভিন্ন হতে পারে।

হেপাটাইটিস এ-এর টিকাও সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর। সাধারণত টিকার ধরন অনুযায়ী দুটি ডোজ দেওয়া হয়। ভ্রমণকারী, নির্দিষ্ট ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি এবং আগে সংক্রমণ বা টিকার মাধ্যমে সুরক্ষা তৈরি হয়নি—এমন মানুষের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে এই টিকা নেওয়া যেতে পারে।

৪. এইচপিভি টিকা

হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা এইচপিভি একটি সাধারণ ভাইরাস, যার কিছু ধরন জরায়ুমুখের ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের কারণ হতে পারে। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে এইচপিভি টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিশোর-কিশোরীদের জন্য, বিশেষ করে ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার আগেই, এই টিকা নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর। তবে বয়স ও পূর্ববর্তী টিকাদানের ইতিহাস অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদেরও টিকা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। সাধারণত ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সে টিকাদান শুরু করলে দুই ডোজ দেওয়া হয়। ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সে শুরু করলে সাধারণত তিন ডোজ প্রয়োজন হয়। তবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হলে ডোজের সূচি ভিন্ন হতে পারে।

এইচপিভি টিকা ভবিষ্যতে ভাইরাসের সংক্রমণ ও সংশ্লিষ্ট কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। টিকা নেওয়ার পর ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা, হালকা জ্বর, মাথাব্যথা বা ক্লান্তি হতে পারে। বয়সসীমা ও প্রয়োজন অনুযায়ী টিকা নেওয়ার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৫. টিটেনাসের টিকা

টিটেনাস একটি গুরুতর ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। সাধারণত দূষিত মাটি, ধুলা বা ময়লায় থাকা ব্যাকটেরিয়ার স্পোর কাটা বা ক্ষতস্থানের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে এই রোগ হতে পারে। এতে পেশিতে তীব্র সংকোচন ও খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। শৈশবে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় টিটেনাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়া হয়। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট বিরতিতে বুস্টার ডোজের প্রয়োজন হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতি ১০ বছর অন্তর বুস্টার নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

গর্ভাবস্থায় মা ও নবজাতকের সুরক্ষার জন্যও টিটেনাস-সম্পর্কিত টিকা গুরুত্বপূর্ণ। আবার গভীর, ময়লাযুক্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষত হলে আগে টিকা নেওয়ার ইতিহাস এবং ক্ষতের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত ডোজ বা অন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের আঘাতের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

টিকা নেওয়ার আগে যা মনে রাখা জরুরি

প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সব টিকা একইভাবে প্রয়োজন হয় না। বয়স, আগের টিকাদানের ইতিহাস, দীর্ঘমেয়াদি রোগ, গর্ভাবস্থা, পেশাগত ঝুঁকি, ভ্রমণের পরিকল্পনা এবং বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধের ওপর টিকা নির্বাচনের বিষয়টি নির্ভর করে।

টিকা নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা ভালো:

-আগে কোন কোন টিকা নিয়েছেন, তার তথ্য সংগ্রহ করুন।
-দীর্ঘমেয়াদি রোগ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমানোর ওষুধ গ্রহণের বিষয়টি চিকিৎসককে জানান।
-টিকার ডোজ ও সময়সূচি সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
-কোনো টিকার পর গুরুতর অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলে তা অবশ্যই জানান।
-টিকা নেওয়ার পর অস্বাভাবিক বা গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
-সুস্থ থাকার জন্য শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধও গুরুত্বপূর্ণ। বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ করলে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি নিজের টিকাদানের ইতিহাস পর্যালোচনা করে চিকিৎসকের সঙ্গে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা উচিত।

টিকার প্রয়োজন, ডোজ ও সময়সূচি ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য; ব্যক্তিগত চিকিৎসা-পরামর্শের বিকল্প নয়।

Advertisements