বিশ্বে বছরে নষ্ট হয় ১৩২ কেজি খাবার, সবচেয়ে বেশি নষ্ট করে মালদ্বীপ

বিশ্বের একদিকে কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হচ্ছে মানুষের খাবারের টেবিলে পৌঁছানোর আগেই। উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁ—প্রতিটি পর্যায়েই ঘটছে খাবারের অপচয়। এতে একদিকে বাড়ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর পড়ছে ভয়াবহ চাপ।
বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে আটটি দেশের পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি দেশই আফ্রিকার। ১২২টি দেশের তালিকায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে সোমালিয়া। এরপর রয়েছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, চাদ ও মাদাগাস্কার। সুদান, দক্ষিণ সুদান, বুরুন্ডি ও ইয়েমেনেও ক্ষুধার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তবে সংঘাত ও প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে এসব দেশের সুনির্দিষ্ট স্কোর নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
ক্ষুধা ও খাদ্যসংকটের এমন বাস্তবতার বিপরীতে বিশ্বজুড়ে খাবার অপচয়ের পরিমাণ উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ১৩ শতাংশ ফসল কাটার পর থেকে খুচরা বিক্রির পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। গুদামজাতকরণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে এই ক্ষতি ঘটে। বিশেষ করে ফলমূল ও শাকসবজির অপচয়ের হার বেশি। সরবরাহব্যবস্থায় নষ্ট হওয়া এসব খাবারের বার্ষিক বাজারমূল্য ৪০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। খাবার দোকানে পৌঁছানোর পরও অপচয় থেমে থাকে না। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার নষ্ট হয়েছে। ভোক্তাদের জন্য বরাদ্দ করা মোট খাবারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এভাবে অপচয় হয়। ২০ টন ধারণক্ষমতার ট্রাকে এই বিপুল পরিমাণ খাবার পরিবহন করতে হলে প্রয়োজন হবে প্রায় ৫ কোটি ২৫ লাখ ট্রাক।
খাবার অপচয়ের সবচেয়ে বড় দায় বাসাবাড়ির। মোট অপচয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটে ঘরে, ২৮ শতাংশ রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এবং বাকি ১২ শতাংশ দোকানপাটে। অর্থাৎ, খাদ্য অপচয় কমানোর ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভ্যাস ও পারিবারিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশ্বে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ১৩২ কেজি খাবার নষ্ট করেন। এর মধ্যে প্রায় ৭৯ কেজি খাবারই অপচয় হয় বাসাবাড়িতে। তবে সব দেশে অপচয়ের চিত্র এক নয়। ইউএনইপির তথ্য বলছে, উষ্ণ আবহাওয়ার দেশগুলোতে ঘরোয়া পর্যায়ে খাবার নষ্ট হওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তাজা কৃষিপণ্যের বেশি ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত রেফ্রিজারেশন বা হিমায়ন সুবিধার অভাবকে বিবেচনা করা হয়।
মাথাপিছু খাবার অপচয়ের হিসাবে মালদ্বীপ রয়েছে শীর্ষে। দেশটিতে বছরে জনপ্রতি প্রায় ২৬০ কেজি খাবার নষ্ট হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এ তালিকায় এরপর রয়েছে সিরিয়া, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, সিশেলস, মেক্সিকো ও তিউনিসিয়া। এসব দেশে মাথাপিছু বার্ষিক খাবার অপচয়ের পরিমাণ ২১০ কেজির বেশি। অন্যদিকে, খাবার অপচয়ের হার তুলনামূলক কম এমন দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পেন, যেখানে মাথাপিছু বছরে প্রায় ৩৯ কেজি বা তারও কম খাবার নষ্ট হয়।
খাবার অপচয়ের প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য নষ্ট ও অপচয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়। খাবারের সঙ্গে অপচয় হয় তা উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত শ্রম, পানি, জ্বালানি, সার এবং কৃষিজমিও। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪০ কোটি হেক্টর জমিতে এমন খাদ্য উৎপাদন করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের খাওয়ার কাজে লাগে না। এই জমির পরিমাণ বিশ্বের মোট কৃষিজমির প্রায় ২৮ শতাংশ এবং আয়তনে পুরো কানাডার চেয়েও বেশি। ফলে খাবার অপচয় মানে শুধু খাবার ফেলে দেওয়া নয়, বরং মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদেরও অপচয়। পরিবেশের ওপর এর প্রভাবও গুরুতর। বিশ্বে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশের জন্য দায়ী নষ্ট ও অপচয় হওয়া খাবার। ভাগাড়ে ফেলে রাখা খাদ্য পচে মিথেন গ্যাস তৈরি করে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভূমিকা রাখে। এভাবে খাবার অপচয় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে।
বিশ্বে যখন বহু মানুষ পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে অপুষ্টি ও ক্ষুধার শিকার, তখন বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হওয়ার এই চিত্র খাদ্যব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে আনে। পরিকল্পিত কেনাকাটা, প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার রান্না, সঠিকভাবে সংরক্ষণ এবং নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাবার অন্যের কাজে লাগানোর উদ্যোগ অপচয় কমাতে পারে। একই সঙ্গে কৃষি থেকে বাজার পর্যন্ত সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
ক্ষুধা মোকাবিলা ও পরিবেশ রক্ষার জন্য খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত খাবারের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, খাবারের মূল্য শুধু তার বাজারদরে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, প্রকৃতির সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্যনিরাপত্তা।



