১৯ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ৩ কার্তিক ১৪৩৩
বিবিধ

২০২৯ সালের পর অচল হবে ৬ কোটি বাটন ফোন!

_123755326_gettyimages-645863306

দেশে মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে বন্ধ করা হবে টু-জি নেটওয়ার্ক। নির্ধারিত সময়সূচি বাস্তবায়িত হলে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে টু-জি সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর ফলে বর্তমানে টু-জি নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত প্রায় ৬ কোটি মোবাইল হ্যান্ডসেট অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো যোগাযোগের জন্য স্বল্পমূল্যের বাটন ফোন ব্যবহার করেন। এসব ফোনের দাম তুলনামূলক কম এবং সাধারণ কল ও খুদে বার্তা পাঠানোর মতো মৌলিক কাজে এগুলো বেশ কার্যকর। টু-জি সেবা বন্ধ হয়ে গেলে এসব গ্রাহককে বিকল্প প্রযুক্তির ফোন ব্যবহার করতে হবে। এতে নতুন ফোন কেনার খরচ বহন করা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সংগৃহীত

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, টু-জি থেকে ফোর-জি প্রযুক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগ মোবাইল অপারেটরদের জন্য সুবিধাজনক হলেও স্থানীয় হ্যান্ডসেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি বাজারে স্বল্পমূল্যের ফোনের সরবরাহ, গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা এবং অবৈধ হ্যান্ডসেটের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আধুনিক ডিজিটাল সংযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প তৈরি করাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিটিআরসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের পর থেকে নতুন কোনো টু-জি বাটন ফোনের মডেলের অনুমোদন দেওয়া হবে না। ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের পর দেশে টু-জি মোবাইল ফোন উৎপাদন বন্ধ করার কথা রয়েছে। একই বছরের ৩০ জুনের পর বাজারে টু-জি ফিচার ফোন বিক্রিও নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে গ্রাহক পর্যায়ে টু-জি সেবা বন্ধ করে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাকারিয়া শহীদ এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও একসঙ্গে সবকিছু বন্ধ করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। দৈনিক ইত্তেফাককে তিনি বলেন, পরিকল্পনাটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তা না হলে আগের মতো অননুমোদিত বা অবৈধ হ্যান্ডসেটের বাজার বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তার মতে, ২০২৭ সালের মার্চের পর দেশে টু-জি ফোন উৎপাদন বন্ধ হলেও পরবর্তী সময়ে বাজারে অবৈধ ফোনের সরবরাহ বেড়ে যেতে পারে। তাই শুধু সময়সীমা নির্ধারণ না করে ২০২৭ ও ২০২৮ সালে পর্যায়ক্রমে কী পরিমাণ অগ্রগতি অর্জন করা হবে, তারও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

Advertisements

নিম্ন আয়ের মানুষকে ফোর-জি প্রযুক্তির আওতায় আনতে সরকার প্রায় ৫ হাজার টাকায় সাশ্রয়ী স্মার্টফোন বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীদের মতে, এই উদ্যোগ সফল করতে হলে ফোনের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা জরুরি। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত মোট হ্যান্ডসেটের প্রায় ৬৫ শতাংশ টু-জি ফিচার ফোন। এসব ফোনের দাম প্রায় ৯৫০ টাকা থেকে শুরু হয়। বিপরীতে, সাশ্রয়ী ফোর-জি স্মার্টফোনের সর্বনিম্ন দাম প্রায় সাড়ে ৯ হাজার টাকা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ফলে টু-জি ফোনের পরিবর্তে ফোর-জি স্মার্টফোন কিনতে গেলে অনেক গ্রাহককে আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। বিশেষ করে যেসব মানুষ শুধু ফোনকল করা ও গ্রহণ করার জন্য মোবাইল ব্যবহার করেন, তাদের কাছে বেশি দামের স্মার্টফোন কেনা প্রয়োজনের তুলনায় ব্যয়বহুল মনে হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ী ফোর-জি ফিচার ফোনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সাধারণ গ্রাহকদের জন্য উপযুক্ত বিকল্প তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীরা আরও বলছেন, টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করার আগে ফোর-জি ও ফাইভ-জি প্রযুক্তিতে তরঙ্গ ব্যবহারের পরিকল্পনা স্পষ্ট করতে হবে। টু-জি সেবায় ব্যবহৃত তরঙ্গ নতুন প্রযুক্তিতে কাজে লাগানো গেলে নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ পরিবর্তনের ফলে গ্রাহক পর্যায়ে সেবার মান কতটা উন্নত হবে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী দৈনিক ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টু-জি সেবা বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশ সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হবে। অর্থাৎ, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সরকারের কাছে তুলে ধরবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

টু-জি ফোনের ব্যবহার বন্ধের সময়সীমা নিয়ে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীদের উদ্বেগের বিষয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, একটি বাটন ফোনের গড় আয়ুষ্কাল প্রায় আড়াই বছর। তাই নির্ধারিত সময়ের আগেই পুরোনো প্রযুক্তির ফোনের ব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় ২০২৯ সালের পরও অনেক গ্রাহকের হাতে টু-জি ফোন থেকে যাবে, যা নেটওয়ার্ক বন্ধের পর ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সব দিক বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মোবাইল অপারেটররাও টু-জি থেকে ফোর-জি প্রযুক্তিতে দ্রুত রূপান্তরের পক্ষে মত দিয়েছেন। বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, টু-জি থেকে ফোর-জি প্রযুক্তিতে গেলে তরঙ্গ ব্যবহারের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে। এর ফলে সীমিত তরঙ্গ ব্যবহার করেও উন্নত নেটওয়ার্ক সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একই বিষয়ে রবি আজিয়াটা লিমিটেডের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার সাহেদ আলম বলেন, যত দ্রুত টু-জি থেকে ফোর-জি প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে, অপারেটরদের জন্য ততই সুবিধা হবে। তার মতে, বর্তমানে মোবাইল নেটওয়ার্ক মূলত ডেটা সেবাকে কেন্দ্র করে সাজানো হচ্ছে। সে তুলনায় প্রচলিত ভয়েস নেটওয়ার্কের গুরুত্ব আগের চেয়ে কমে এসেছে।

সব মিলিয়ে, টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের উদ্যোগ দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের নতুন অধ্যায় তৈরি করতে পারে। এতে মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা ও তরঙ্গ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রায় ৬ কোটি টু-জি হ্যান্ডসেট ব্যবহারকারীর জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প নিশ্চিত করা, স্থানীয় ফোন উৎপাদনকারীদের প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া এবং অবৈধ ফোনের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের আগে এসব বিষয় কীভাবে সমাধান করা হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এই পরিবর্তন কতটা সহজ হবে।

Advertisements