১১ বছরের দুর্গাপূজা, উদ্যোক্তা থেকে আয়োজক সবাই নারী

চাঁদা সংগ্রহ থেকে বাজার করা, মণ্ডপ সাজানো থেকে শুরু করে পূজার সার্বিক ব্যবস্থাপনা—সবই করেন তাঁরা নিজেরা। দুর্গাপূজার আয়োজনে পুরুষেরাই প্রধান ভূমিকা পালন করেন, এমন প্রচলিত ধারণা ভেঙে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার মাগড়া গ্রামে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন একদল নারী। ‘উজ্জয়িনী’ নামের নারী সংগঠনটির উদ্যোগে টানা ১১ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুর্গাপূজা। তাঁদের এই আয়োজন শুধু ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামাজিক ও পারিবারিক বৈষম্য পেরিয়ে নারীর সক্ষমতা তুলে ধরারও একটি প্রয়াস।
কালিহাতী উপজেলার দশকিয়া ইউনিয়নের মাগড়া গ্রামের এই নারী সংগঠনের সদস্যরা পূজার প্রায় সব দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। আয়োজনের অর্থ সংগ্রহ, কেনাকাটা, মণ্ডপের সাজসজ্জা ও ব্যবস্থাপনা—কোনো কিছুতেই তাঁরা অন্যের ওপর নির্ভর করেন না। শুধু পূজার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন পুরোহিত। বছরের পর বছর তাঁদের এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে।
সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয় ২০০২ সালে। সীমা কর্মকারের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘উজ্জয়িনী’র সঙ্গে শুরুতে যুক্ত ছিলেন শিপ্রা পাল ও বুলবুলি কর্মকার। পরে সংগঠনটি দুর্গাপূজা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো পূজার আয়োজন করেন তাঁরা। সেই ধারাবাহিকতায় এবার উদ্যাপন করছেন ১১তম দুর্গাপূজা। সংগঠনের সম্পাদক সীমা কর্মকারের (৪২) ভাষ্য, নারীদের সামাজিক অবস্থান ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রচলিত নানা বিধিনিষেধ তাঁকে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। ২০০২ সালে অনার্সে ভর্তি হতে গিয়ে তাঁকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। সে সময় নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়া, পর্দা ছাড়া চলাফেরা করা কিংবা স্বামীর চেয়ে বেশি পড়াশোনা করাকে অনেকেই ভালো চোখে দেখতেন না। ধর্মীয় উৎসবের আয়োজনেও পুরুষদের ভূমিকাই ছিল প্রধান।
সেই বাস্তবতা থেকেই নারীরাও যে নিজেদের উদ্যোগে একটি বড় ধর্মীয় উৎসব পরিচালনা করতে পারেন, তা প্রমাণ করার প্রত্যয় নেন তাঁরা। সময়ের সঙ্গে সেই প্রত্যয় রূপ নিয়েছে নিয়মিত আয়োজনের ধারায়। সোমবার দুপুরে কর্মকারপাড়ার অস্থায়ী মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হয় মহাষ্টমীর পূজা। সেখানে নারীদের অঞ্জলি দিতে দেখা যায়। উৎসবের নানা দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একজন নারীকে ঢাক বাজাতেও দেখা যায়। পূজার এই ব্যতিক্রমী আয়োজন দেখতে আসা মানুষের কাছেও বিষয়টি ছিল বিশেষ আকর্ষণের।
টাঙ্গাইল থেকে পূজা দেখতে আসা সুব্রত কুমার তালুকদার জানান, নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজার আয়োজন হতে তিনি এবারই প্রথম দেখেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা তুষার কর্মকারের মতে, উজ্জয়িনীর আয়োজন নারীদের সক্ষমতা ও ক্ষমতায়নের একটি বাস্তব উদাহরণ। সংগঠনটির সভাপতি সীমা কর্মকারের (৪৮) ভাষ্য অনুযায়ী, পূজার প্রতিটি কাজ সদস্যরা নিজেরাই করেন এবং নিজেদের চাঁদা থেকেই আয়োজনের ব্যয় মেটান। শুরুর দিকে তাঁদের উদ্যোগ নিয়ে অনেকের আপত্তি থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের কালিহাতী উপজেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাশীনাথ মজুমদার জানান, এ বছর টাঙ্গাইল জেলায় ১ হাজার ৩৫৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে উজ্জয়িনীর আয়োজনটি জেলায় নারীদের উদ্যোগে পরিচালিত একমাত্র পূজা বলে তিনি উল্লেখ করেন। সংগঠনটিকে এর আগে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পুরস্কৃত করা হয়েছে। এবার বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী সারওয়াত সিরাজ শুক্লা উজ্জয়িনীর সব সদস্যকে শাড়ি উপহার দিয়েছেন। এই স্বীকৃতি তাঁদের দীর্ঘদিনের উদ্যোগের প্রতি সম্মান জানানোর পাশাপাশি কাজ চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহও জোগাচ্ছে।
উজ্জয়িনীর ১১ বছরের পথচলা দেখিয়েছে, সামাজিক বাধা ও প্রচলিত ধারণা অতিক্রম করে নারীরা চাইলে নিজেরাই বড় আয়োজনের নেতৃত্ব দিতে পারেন। ধর্মীয় বিশ্বাস, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে তাঁদের এই উদ্যোগ এখন স্থানীয় পর্যায়ে নারী ক্ষমতায়নের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।



