ডেঙ্গুতে মৃ’ত্যুর প্রধান কারণ শক সিনড্রোম, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সংকটাপন্ন ৭৮ শতাংশ রোগী

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর প্রধান কারণ শক সিনড্রোম, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সংকটাপন্ন ৭৮ শতাংশ রোগী
দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকাও। বছরের শুরু থেকে গত সোমবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে এক লাখ। এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। সংস্থাটির পর্যালোচনা বলছে, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ শক সিনড্রোম। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটছে। সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়া এবং বিপৎসংকেত বুঝতে না পারায় বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর গত সোমবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৩০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১১৯ জনের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করেছে আইইডিসিআর। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় ৭৮ শতাংশ রোগীর শরীরে শকের লক্ষণ ছিল। মৃতদের ৬২ দশমিক ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং ৩১ দশমিক ২ শতাংশের ক্ষেত্রে এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমের উল্লেখ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ১৬ দশমিক ১ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণসহ ডেঙ্গুর তথ্য রয়েছে। অন্যান্য কারণের উল্লেখ রয়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে।
চিকিৎসা নিতে দেরি, বাড়ছে জটিলতা
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর কখন চিকিৎসা নেওয়া হচ্ছে, তা মৃত্যুঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আইইডিসিআরের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চিকিৎসা নেওয়ার সময় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া রোগীদের ৬৮ শতাংশ উপসর্গ শুরুর তিন দিনের বেশি সময় পর চিকিৎসা নিতে গেছেন। প্রায় ৬৬ শতাংশ রোগী গুরুতর জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতালে যাওয়ার আগে ৩৫ শতাংশ রোগী ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেছিলেন। আবার হাসপাতালে ভর্তির এক দিনের মধ্যেই মারা গেছেন ৩৮ শতাংশ রোগী।
আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ডেঙ্গু রোগীরা হাসপাতালে আসতে দেরি করছেন। ফলে হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় অনেকের শারীরিক অবস্থা জটিল হয়ে পড়ছে। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরু করার আগেই রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ফার্মেসি থেকে ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করছেন। আবার অনেকে ডেঙ্গুর জটিলতার লক্ষণ বুঝতে না পারায় চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ডেঙ্গু সন্দেহ হলে শুরু থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়। বরং জ্বরের কয়েক দিন পরও রোগীর অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, অস্থিরতা কিংবা হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ সেবন থেকেও বিরত থাকতে হবে।
মধ্যবয়সী ও তরুণদের মৃত্যু বেশি
পর্যালোচনায় বয়সভিত্তিক তথ্যেও গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে। মৃত ১১৯ জনের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ছিলেন ২৫ জন। ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়স এবং ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ছিলেন ২০ জন করে। অর্থাৎ ২১ থেকে ৫০ বছর বয়সী মোট ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা পর্যালোচনা করা মোট মৃত্যুর প্রায় ৫৫ শতাংশ।
লিঙ্গভিত্তিক তথ্য পাওয়া ১১৭ জনের মধ্যে ৫২ শতাংশ নারী। অন্যদিকে, বসবাসের স্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া ৮৯ জনের মধ্যে ৫৫ শতাংশ ছিলেন গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা। এসব তথ্য ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি ও রোগীদের পরিস্থিতি বুঝতে সহায়ক হলেও, শুধু এ পরিসংখ্যান দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বয়স, লিঙ্গ বা এলাকার মানুষের মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
আইসিইউ প্রয়োজন হয়েছে ৭০ শতাংশের
গুরুতর অসুস্থ ১০৩ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে আইইডিসিআর দেখেছে, তাঁদের মধ্যে ৭২ জনের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল। অর্থাৎ এই রোগীদের প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য নিবিড় পরিচর্যা দরকার হয়েছে। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রোগীদের বড় একটি অংশের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ার বিষয়টি এ তথ্যেও স্পষ্ট।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর এই পর্যালোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—শুধু মশার কামড় এড়ানো নয়, আক্রান্ত হলে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা নেওয়াও সমান জরুরি। জ্বরকে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে অবহেলা করা, বিপৎসংকেত উপেক্ষা করা কিংবা নিজের মতো ওষুধ খাওয়া পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলাই হতে পারে মৃত্যুঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।



