ভারতের যে গ্রামে মেয়ে জন্মালেই লাগানো হয় ১১১টি গাছ, কেন এই প্রথা?

ভারতের একটি গ্রামে কন্যাশিশুর জন্ম মানেই নতুন জীবনের আনন্দ। আর সেই আনন্দকে স্মরণীয় করে রাখতে লাগানো হয় ১১১টি গাছ। শুধু বৃক্ষরোপণই নয়, নবজাতক মেয়েটির ভবিষ্যতের জন্যও রাখা হয় অর্থ। একটি মেয়ের অকালমৃত্যুর শোক থেকে জন্ম নেওয়া এই উদ্যোগ আজ পরিবেশ সংরক্ষণ, নারী ক্ষমতায়ন ও কন্যাশিশুর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
রাজস্থানের পিপলান্ত্রি গ্রামের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন শ্যাম সুন্দর পালিওয়াল। ২০০৬ সালে তাঁর ১৬ বছর বয়সী মেয়ে কিরণ মারা যায়। মেয়ের স্মৃতিকে ধরে রাখতে তিনি একটি গাছ লাগান। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত শোক ধীরে ধীরে রূপ নেয় পুরো গ্রামের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রেরণায়।
শোক থেকে পরিবর্তনের শুরু
একসময় পিপলান্ত্রি গ্রামের নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সুযোগ ছিল সীমিত। শিক্ষা ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল কম। অন্যদিকে খননকাজ এবং নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।
এই পরিস্থিতিতে পালিওয়াল উপলব্ধি করেন, কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষা এবং প্রকৃতি রক্ষার উদ্যোগ একসঙ্গে নেওয়া সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই গ্রামে কন্যাশিশুর জন্মের সঙ্গে বৃক্ষরোপণের প্রথা চালু হয়। প্রতিটি নবজাতক মেয়ের সম্মানে লাগানো হতে থাকে ১১১টি গাছ।
উদ্যোগটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মেয়েটির ভবিষ্যতের জন্য অর্থ সঞ্চয়ের ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে জন্মের মুহূর্ত থেকেই তার শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হয়। কন্যাসন্তানকে বোঝা নয়, বরং পরিবারের মূল্যবান সদস্য হিসেবে দেখার বার্তাও ছড়িয়ে পড়ে।
গাছের সঙ্গে বড় হয় স্বপ্ন
পিপলান্ত্রির এই উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো, গাছ লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয় না। গাছের পরিচর্যা, পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি সেখানে অ্যালোভেরা চাষের মতো কার্যক্রমও গড়ে ওঠে।
অ্যালোভেরা চাষ ও সংশ্লিষ্ট কাজের মাধ্যমে স্থানীয় নারীদের আয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগটি নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। গাছের যত্ন নেওয়া, চাষাবাদ এবং উৎপাদিত পণ্যকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জীবিকার নতুন সম্ভাবনা।
এভাবে একটি সামাজিক উদ্যোগ ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে ভূমিকা রেখেছে। কন্যাশিশুর জন্ম উদ্যাপনের পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধও পেয়েছে নতুন গুরুত্ব।
একটি গ্রামের গল্প, সবার জন্য শিক্ষা
পিপলান্ত্রির উদ্যোগের কথা ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বাইরেও। পরিবেশ সংরক্ষণ ও নারী ক্ষমতায়নকে একই ধারায় যুক্ত করার কারণে গ্রামটি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য কেবল কতটি গাছ লাগানো হয়েছে, তা দিয়ে মাপা যায় না। এর প্রকৃত গুরুত্ব রয়েছে মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনার মধ্যে। কন্যাশিশুর জন্মকে কেন্দ্র করে গাছ লাগানো একটি প্রতীকী কাজ হলেও এর বার্তা অনেক বড়। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য যেমন যত্ন, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা প্রয়োজন, তেমনি একটি গাছের বেড়ে ওঠার জন্যও প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা। দুটির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ভবিষ্যতের আশা। শ্যাম সুন্দর পালিওয়ালের কাছে মেয়ের স্মৃতিতে লাগানো সেই প্রথম গাছটি ছিল ব্যক্তিগত ভালোবাসার প্রকাশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই স্মৃতি হয়ে উঠেছে সামাজিক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা। কিরণ আর নেই, তবে তাঁর স্মৃতিকে ঘিরে শুরু হওয়া উদ্যোগ আজও মনে করিয়ে দেয়—একটি মানুষের শোকও কখনো কখনো অসংখ্য মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বালাতে পারে।
পিপলান্ত্রির গল্প তাই কেবল ১১১টি গাছ লাগানোর গল্প নয়। এটি এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন, যেখানে প্রতিটি কন্যাশিশুর জন্ম উদ্যাপিত হবে, নারীরা পাবেন স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ এবং প্রকৃতি পাবে নতুন করে বেঁচে ওঠার অবকাশ।



