ক্যারিয়ারের শীর্ষে থেকেও পরিবারকে সময় দিতে চাকরি ছাড়লেন মাইক্রোসফটের কর্মকর্তা

২৩ বছরের কর্মজীবন, প্রযুক্তি দুনিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং আকর্ষণীয় পদ—সবকিছুর পরও জীবনের অগ্রাধিকার বদলে ফেললেন কেশবন শানমুগম। মাইক্রোসফটের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছেড়ে ভারতে থাকা বয়স্ক বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তাঁর এই সিদ্ধান্ত নতুন করে সামনে এনেছে পরিবার ও কর্মজীবনের ভারসাম্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক প্রশ্ন।
ক্যারিয়ারের সাফল্য, আন্তর্জাতিক পরিচিতি কিংবা বড় প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদ—এসব অর্জন করতে অনেকেই জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন। কিন্তু সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও কেউ কেউ উপলব্ধি করেন, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্তগুলো কাটছে প্রিয়জনদের কাছ থেকে দূরে। এমন উপলব্ধি থেকেই ব্যতিক্রমী এক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কেশবন শানমুগম।

দীর্ঘ ২৩ বছর মাইক্রোসফটে কাজ করার পর অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তাঁর এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ভারতে বসবাসকারী বয়স্ক বাবা-মায়ের পাশে থাকার ইচ্ছা। পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে এবার পরিবারের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটাতে চান তিনি। লিংকডইনে দেওয়া এক পোস্টে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান কেশবন। সেখানে তিনি লেখেন, মাইক্রোসফটে তাঁর ২৩ বছরের পথচলা ছিল চমৎকার। তবে ভারতে থাকা বয়স্ক বাবা-মায়ের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানোর জন্যই তিনি চাকরি থেকে অবসর নিচ্ছেন।
কেশবনের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। এই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির বিকাশে মাইক্রোসফটের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বিশেষ করে এক্সেল কো-পাইলট এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এআই প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
দীর্ঘদিনের কর্মজীবনে সহকর্মীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক এবং আকর্ষণীয় সব প্রকল্প ছেড়ে আসা যে সহজ ছিল না, সেটিও স্বীকার করেছেন তিনি। মেধাবী সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করা এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সুযোগ তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ। তবু জীবনের এই পর্যায়ে এসে পেশাগত সাফল্যের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। কেশবনের এই সিদ্ধান্ত কেবল একজন প্রযুক্তি কর্মকর্তার অবসরের খবর নয়; বরং আধুনিক কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে আনে। প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশে পদোন্নতি, সাফল্য ও অর্জনের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেকেই পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সময় হারিয়ে ফেলেন। বিশেষ করে কর্মসূত্রে দূরে থাকা বাবা-মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের পাশে থাকার প্রয়োজন আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়।
অর্থ, সম্মান কিংবা পেশাগত পরিচিতি জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়ের বিকল্প সব সময় পাওয়া যায় না। প্রিয়জনদের সঙ্গে দৈনন্দিন মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া, তাঁদের প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা কিংবা একসঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ—এসবের মূল্য অনেক সময় উপলব্ধি হয় জীবনের পরিণত পর্যায়ে এসে।
কেশবন শানমুগমের সিদ্ধান্ত সেই উপলব্ধিরই প্রতিফলন। প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্মাণে দীর্ঘ সময় ব্যয় করা এই কর্মকর্তা এবার নিজের জীবনের অন্য এক অধ্যায় শুরু করতে চান। সেখানে বড় কোনো প্রকল্পের সময়সীমা কিংবা পেশাগত লক্ষ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে বাবা-মায়ের সান্নিধ্য।
কর্মজীবনের ২৩ বছরের অধ্যায় শেষ হলেও তাঁর সামনে খুলে যাচ্ছে নতুন এক সময়ের দরজা। আর সেই সময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পরিবার—যেখানে সাফল্যের সংজ্ঞা হয়তো পদবি কিংবা অর্জনে নয়, বরং প্রিয় মানুষগুলোর পাশে থাকার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়।



