ডেটা সেন্টারের দাপটে পানির সংকট, তিন মাস ধরে শুকনো বাসার কল

প্রযুক্তির বিকাশে বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে শুরু করে অনলাইন সেবা—সবকিছুর পেছনেই বাড়ছে ডেটা সেন্টারের গুরুত্ব। কিন্তু এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মূল্য যদি দিতে হয় সাধারণ মানুষকে, যদি নিজেদের ঘরেই পানির সংকটে পড়তে হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। ইন্দোনেশিয়ার বাতাম দ্বীপে এখন এমনই এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে গড়ে উঠছে একের পর এক ডেটা সেন্টার, অন্যদিকে পানির অভাবে দুর্ভোগে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সম্প্রতি দ্বীপটির নংসা ডিজিটাল পার্কে একটি ডেটা সেন্টারের সামনে জড়ো হন প্রায় ৩০০ বাসিন্দা। কারও হাতে খালি প্লাস্টিকের বোতল, কারও হাতে পানির পাত্র। তাদের এই প্রতিবাদের ভাষা ছিল স্পষ্ট—বাড়িতে পানি নেই, অথচ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখতে পানির অভাব হচ্ছে না। বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডেটা সেন্টারের বিস্তার দ্বীপটির সীমিত পানিসম্পদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার নিয়মিত পানির সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, তাদের দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বিক্ষোভকারী দেওয়ি সুসান্তি বিবিসিকে জানান, টানা তিন মাস ধরে তাদের বাড়ির কল দিয়ে এক ফোঁটা পানিও আসেনি। অথচ ডেটা সেন্টার স্থাপনের আগে তাদের এলাকায় পানির সরবরাহ মোটামুটি নির্ভরযোগ্য ছিল। এখন পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে তাকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পানির সংকট শুধু দৈনন্দিন কাজকর্মেই সীমাবদ্ধ নেই, আঘাত হানছে পরিবারের অর্থনীতিতেও। দেওয়ির ভাষ্য অনুযায়ী, চাল কেনার জন্য যে অর্থ জমিয়ে রাখা হয়, তার একটি অংশ এখন পানির ড্রাম কেনার পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। তার স্বামীকে পানি সংগ্রহের জন্য রাত জেগে অপেক্ষা করতে হয়। পরদিন সকালে আবার কাজে যেতে হয় তাকে। ফলে একটি মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই পরিবারটির সময়, অর্থ ও শ্রম—সবকিছুই ব্যয় হচ্ছে।
পানির সংকটের পেছনে কী?
বাতাম দ্বীপের পানি সরবরাহকারী সংস্থা জানিয়েছে, সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করতে কাজ চলছে। তবে ডেটা সেন্টারগুলোর পানির চাহিদা সংকট বাড়াচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সংস্থাটি কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে, দ্বীপটির বাণিজ্য ও শিল্প খাত তদারকির দায়িত্বে থাকা বিপি বাতাম কর্তৃপক্ষ দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টিকে পানির সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাসিন্দাদের জন্য বরাদ্দ পানি ডেটা সেন্টারগুলোতে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছে তারা। অর্থাৎ, সংকটের কারণ নিয়ে কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, দ্বীপটির পানির উৎসগুলো ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে। প্রাকৃতিক মিঠাপানির উৎসের অভাবে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের বসবাস এই দ্বীপে। তাদের পানির প্রধান ভরসা বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য নির্মিত ছয়টি কৃত্রিম জলাধার।
চলতি বছর পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর পেছনে ঐতিহাসিক মাত্রার ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতির প্রভাব থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন আকার ভূমি ইন্দোনেশিয়ার একটি সিমুলেশন অনুযায়ী, বৃষ্টি না হলে নংসা জলাধার আগামী এক মাসের মধ্যে শুকিয়ে যেতে পারে। এই জলাধার থেকেই দেওয়ির গ্রামের বাসিন্দারা পানি পান।
প্রযুক্তির শীতলতায় লাগে কত পানি?
ডেটা সেন্টার মূলত বিপুলসংখ্যক সার্ভার ও তথ্য সংরক্ষণের যন্ত্রপাতি নিয়ে গড়ে ওঠা অবকাঠামো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন সেবা, তথ্য সংরক্ষণ ও বিভিন্ন ডিজিটাল কার্যক্রম পরিচালনায় এসব কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সার্ভার সচল রাখতে বিপুল বিদ্যুতের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় কার্যকর শীতলীকরণব্যবস্থা।
কম্পিউটার ও সার্ভারের যন্ত্রাংশ দীর্ঘ সময় কাজ করলে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কিছু শীতলীকরণব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি লাগে। ফলে বড় ডেটা সেন্টারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর চাপ তৈরির আশঙ্কাও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণায় একটি সাধারণ ডেটা সেন্টারে দৈনিক প্রায় তিন লাখ মার্কিন গ্যালন পানি ব্যবহারের হিসাব উঠে এসেছে। এই পরিমাণ পানি দেশটির প্রায় এক হাজার পরিবারের দৈনিক ব্যবহারের সমান। মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বড় ডেটা সেন্টারে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ২০০ পরিবারের সমপরিমাণ পানি ব্যবহার হতে পারে। একই সঙ্গে এর বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২২ হাজার বাড়ির ব্যবহারের সমান হতে পারে।
তবে সব ডেটা সেন্টারে পানির ব্যবহার এক রকম নয়। কেন্দ্রের আকার, শীতলীকরণ প্রযুক্তি, আবহাওয়া ও পরিচালনপদ্ধতির ওপর পানির চাহিদা নির্ভর করে। তারপরও পানিস্বল্পতাপ্রবণ অঞ্চলে এসব স্থাপনার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিনিয়োগের নতুন গন্তব্য বাতাম
পানির সংকটের মধ্যেই বাতামকে ডিজিটাল প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে। কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ১০টি ডেটা সেন্টার প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি নংসা ডিজিটাল পার্কে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। দুটি ডেটা সেন্টার ইতিমধ্যে চালু হয়েছে এবং তৃতীয়টির নির্মাণকাজ চলছে। আরও অন্তত ছয়টি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছে বিপি বাতাম। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দ্বীপটির ডেটা সেন্টার খাতে বিনিয়োগ ৬৭০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে প্রতিবেশী সিঙ্গাপুরের। ফেরিতে সিঙ্গাপুর থেকে বাতামে পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে।
জমি ও জ্বালানির সীমাবদ্ধতার কারণে ২০১৯ সালে সিঙ্গাপুর ডেটা সেন্টার নির্মাণ স্থগিত করেছিল। ২০২২ সালে দক্ষতাসংক্রান্ত নতুন মানদণ্ড চালুর পর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এরপর বিনিয়োগকারীরা সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি বিকল্প গন্তব্য খুঁজতে শুরু করেন। ভৌগোলিক নৈকট্য, তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলদেশীয় কেব্ল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগের কারণে বাতাম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তবে বিনিয়োগের এই প্রবাহের সঙ্গে বাড়ছে পরিবেশগত উদ্বেগও। সিঙ্গাপুরের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যেও ডেটা সেন্টারের বিস্তার ঘটেছে। সেখানে শব্দদূষণ, ধুলাবালি, পানির সংকট ও বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অসন্তোষের মুখে কর্তৃপক্ষকে এসব কেন্দ্রের সম্পদ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হয়েছে।
উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য কতটা জরুরি?
বাতামে পানির সংকট নিয়ে প্রতিবাদ নতুন নয়। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বিক্ষোভের পর কর্তৃপক্ষ নতুন ডেটা সেন্টার স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানিয়েছে, মিঠাপানির জন্য জলাধারের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের পানি লবণমুক্ত করার প্ল্যান্ট তৈরি করতে হবে। সমুদ্রের পানিকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার এই উদ্যোগ পানির উৎসের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, পরিচালন ব্যয় এবং পরিবেশগত প্রভাবের ওপর। পানির সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটানোর ব্যবস্থাও বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানিয়েছিল দ্বীপটির পানি সরবরাহকারী সংস্থা। কিন্তু সাময়িক উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলাধার সংরক্ষণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পানির ব্যবহার সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করাও জরুরি।
প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগ একটি অঞ্চলে কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি স্থানীয় মানুষের নিরাপদ পানির অধিকারকে সংকটে ফেলে, তাহলে তার সুফল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়। বাতামের বাসিন্দাদের প্রশ্ন তাই শুধু ডেটা সেন্টারের পানির ব্যবহার নিয়ে নয়; বরং উন্নয়নের অগ্রাধিকার নিয়েও। যে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে আরও সহজ করার কথা, সেই প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে যদি মানুষকে পানির জন্য রাত জাগতে হয়, তাহলে উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ ও জনজীবনের সুরক্ষা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে—সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।



