১২ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

যাত্রীসংকটে পিংক বাস, প্রতিদিন ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান

52-6a84421f1d251

রাজধানীতে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে চালু করা পিংক বাস সেবা প্রত্যাশিত যাত্রী পাচ্ছে না। সীমিত রুট, দিনে মাত্র দুটি ট্রিপ এবং প্রচারের ঘাটতির কারণে সেবাটি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। গত ১৮ আগস্ট চালুর পর থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) এই সেবায় প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে বলে জানা গেছে।

রাজধানীর গণপরিবহনে নারীদের যাতায়াত দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। বাস ও ট্রেনে ভিড়, অস্বস্তিকর পরিবেশ এবং হয়রানির আশঙ্কা তাঁদের চলাচলকে কঠিন করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবা চালুর উদ্যোগ নেয় বিআরটিসি। তবে সেবা চালুর পর যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী পরিচালনব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় উদ্যোগটি এখন নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে।

সীমিত ট্রিপে ভোগান্তি যাত্রীদের

পিংক বাসে যাত্রীসংখ্যা কম থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সীমিত ট্রিপ ও সময়সূচির সমস্যা। যাত্রীদের অভিযোগ, বর্তমানে বাসগুলো দিনে মাত্র দুটি ট্রিপ পরিচালনা করে—একটি সকালে এবং অন্যটি বিকেলে। ফলে নির্ধারিত সময়ে বাস না পেলে বা ট্রিপ মিস করলে তাঁদের বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়।

এতে নারীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য নিয়ে সেবাটি চালু করা হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দিনের বড় একটি সময় বাসের আসন ফাঁকা থাকায় একদিকে যেমন যাত্রীদের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না, অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় তুলতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

পরিকল্পনার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন

Advertisements

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, পিংক বাস চালুর আগে নারীদের যাতায়াতের ধরন, সম্ভাব্য যাত্রীসংখ্যা, প্রয়োজনীয় রুট এবং উপযুক্ত সময়সূচি নিয়ে বিস্তারিত মাঠপর্যায়ের গবেষণা করা প্রয়োজন ছিল। যাত্রীরা কোথা থেকে কোথায় বেশি যাতায়াত করেন এবং কোন সময়ে তাঁদের জন্য বিশেষ বাসের চাহিদা বেশি—এসব বিষয় বিবেচনায় না নেওয়ায় সেবাটি প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছে না।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ মনে করেন, ঢাকার মতো ব্যস্ত নগরে নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবা দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে যাত্রীদের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিতে হবে। উপযুক্ত রুট ও পরিচালনব্যবস্থা ছাড়া শুধু নারীদের জন্য আলাদা বাস চালু করলেই সেবাটি কার্যকর হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানো, সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ, নির্ধারিত স্টপেজে বাসের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পিংক বাসের ব্যবহার বাড়তে পারে। একই সঙ্গে যাত্রীদের মতামত নিয়ে নিয়মিত সেবার মান মূল্যায়ন করাও জরুরি।

বহরে যুক্ত হতে পারে ইলেকট্রিক বাস

যাত্রীসংকট ও লোকসানের চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পিংক বাস সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে সরকার। সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানিয়েছেন, নারীদের মধ্যে সেবাটি গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করায় ভবিষ্যতে বহরে ইলেকট্রিক বাস যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার যখন ইলেকট্রিক বাস চালুর দিকে এগোবে, তখন পিংক বাস সেবাতেও এসব বাস যুক্ত করা হবে।

বর্তমানে রাজধানীতে ১০টি পিংক বাস চলাচল করছে। এই সংখ্যা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি রুট, ট্রিপ ও সময়সূচির সমস্যাগুলো সমাধান করা না গেলে লোকসান কমানো কঠিন হতে পারে।

সেবাটিকে কার্যকর করতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

পিংক বাসের মূল উদ্দেশ্য নারীদের জন্য নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন নিশ্চিত করা। তাই শুধু নতুন বাস যুক্ত করাই নয়, বরং যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াতের চাহিদা অনুযায়ী সেবাটিকে সাজানো প্রয়োজন।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত যাত্রী জরিপ, চাহিদাভিত্তিক রুট নির্ধারণ, ট্রিপের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কার্যকর প্রচারের মাধ্যমে সেবাটিকে আরও জনপ্রিয় করা সম্ভব। পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় ও আয় পর্যালোচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য পিংক বাস একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও কার্যকর পরিচালনার ওপর। সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই সেবা রাজধানীর গণপরিবহনে নারীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

Advertisements