শনিবার শুভ মহালয়া

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা নিয়ে আগামীকাল শনিবার উদযাপিত হবে শুভ মহালয়া। এদিন মহালয়া পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে দেবীপক্ষের ক্ষণগণনা। ভোরে চণ্ডীপাঠ, বিশেষ পূজা ও পূর্বপুরুষদের স্মরণে তর্পণের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
মহালয়া শুধু দুর্গাপূজার আগমনী বার্তার দিন নয়, প্রয়াত পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তিথি। হিন্দুধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, এদিন জল, তিল ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তর্পণ করে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।
পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনার মধ্যবর্তী এই তিথিকে মহালয়া বলা হয়। শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি ও আয়োজনের ক্ষেত্রে দিনটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে দেবী দুর্গার আবাহন করা হয়। বিভিন্ন মন্দিরে মহালয়ার ঘট স্থাপন, বিশেষ পূজা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা হয়।
পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হলে তাকে পরাজিত করার জন্য দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। দেবতাদের দেওয়া বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সিংহবাহিনী দেবী মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর দেবী তাকে পরাজিত ও বধ করেন। মহালয়াকে ঘিরে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস ও পুরাণকথায় এই কাহিনি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
মহালয়ার দিন ভোর থেকেই অনেকেই নদী বা জলাশয়ে গিয়ে প্রয়াত আত্মীয়স্বজন ও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করেন। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পিতৃপক্ষে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করা পুণ্যকর্ম। এদিন কেউ কেউ পূজা ও ব্রাহ্মণদের বস্ত্র দানের মাধ্যমেও পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব। তবে মহালয়া থেকেই পূজার আবহ ছড়িয়ে পড়বে বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে। প্রতিমা নির্মাণ, রং করা, প্যান্ডেল তৈরি এবং আলোকসজ্জার প্রস্তুতিও ইতোমধ্যে চলছে।
মহালয়া উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও পূজামণ্ডপে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে শনিবার ভোরে চণ্ডীপাঠসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি রয়েছে।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুবাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন জানান, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহালয়ার অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া শনিবার ভোরে রাজধানীর রমনা কালী মন্দিরেও মহালয়া উদযাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন মন্দির পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মিন্টু বসু।
রাজধানীর অন্যান্য ধর্মীয় স্থানেও মহালয়া উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন থাকবে। ঢাকাস্থ রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল উপাসনালয়, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, স্বামীবাগের লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও মন্দির, রামসীতা মন্দির এবং জয়কালী মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থানে ভোর থেকে চণ্ডীপাঠ, চণ্ডীপূজা ও বিশেষ পূজার মধ্য দিয়ে মহালয়ার আনুষ্ঠানিকতা পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল উপাসনালয়ের প্রধান পুরোহিত সাধন চক্রবর্তী জানান, প্রচলিত পঞ্জিকা অনুযায়ী এ বছর দেবী দুর্গা ঘোটকে বা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আগমন করবেন এবং নৌকায় চড়ে বিদায় নেবেন। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসে দেবীর আগমন ও গমনের বাহনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও লোকাচার প্রচলিত রয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বাসসকে জানিয়েছেন, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে দেশজুড়ে পূজা কমিটি ও মন্দির কর্তৃপক্ষ প্রতিমা স্থাপন, প্যান্ডেল নির্মাণ, সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
এদিকে, পূজামণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদান বাড়ানোর কথাও জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ বছর দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোর সরকারি অনুদান চার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা করা হয়েছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটি শুক্র ও শনিবারের সঙ্গে বর্ধিত ছুটি যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বর্ধিত ছুটি উৎসব উদযাপন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ বাড়াবে।
পাঁচ দিনব্যাপী উৎসবকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন এলাকার পূজা কমিটি, মন্দির ও মণ্ডপগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্যান্ডেল নির্মাণ ও সাজসজ্জার পাশাপাশি প্রতিমা স্থাপন, আলোকসজ্জা, পূজার উপকরণ সংগ্রহ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎসব চলাকালে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি হলেও এর আবেদন ধর্মীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরেও বিস্তৃত। প্রতি বছর এ উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি হয়। মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দুর্গোৎসব তাই ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।



