৯ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

কেমন আছেন মিন্নি?

resize

রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার প্রায় ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন (ডেথ রেফারেন্স) ও আসামিদের আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে দিন কাটছে এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির। কারাগারে তার সময় কাটছে মূলত ইবাদত-বন্দেগিতে। অন্যদিকে, দ্রুত শুনানি ও জামিনের আশায় রয়েছেন তার আইনজীবীরা।

আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাইকোর্টে মামলাটির শুনানির জন্য পেপারবুক প্রস্তুতের কাজ চলছে। তবে শুনানি কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট কোনও সময় জানা যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কনডেম সেলে অবস্থান এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরে এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার বিচার শেষে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারিক আদালত।

রায়ের চার দিন পর, ওই বছরের ৪ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। একই বছর মিন্নিসহ ছয় আসামি নিজেদের দণ্ডের বিরুদ্ধে পৃথক আপিল করেন। পরবর্তী সময়ে অসুস্থতা ও অন্যান্য কারণ দেখিয়ে ২০২২ সালে মিন্নির পক্ষে জামিনের আবেদন করা হয়। তবে সেই আবেদনও এখনও শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি এ মামলার ক্ষেত্রেও সামনে এসেছে। বর্তমানে হাইকোর্টে ১ হাজার ২৬৫টি ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েক বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ৮৪৩টি।

ডেথ রেফারেন্স কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির জানান, বর্তমানে হাইকোর্টে ২০১৯ সালে আসা ডেথ রেফারেন্সগুলোর শুনানি চলছে। রিফাত হত্যা মামলার আবেদনটি বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা খোঁজ নিয়ে জানাতে পারবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

Advertisements

মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না যুগান্তরকে জানান, মামলায় মিন্নির সম্পৃক্ততা নিয়ে সাক্ষীদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে বলে আসামিপক্ষ মনে করে। এ ছাড়া কারাগারে তার অসুস্থতা এবং নারী বন্দি হিসেবে তার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করা হয়।

আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১১ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আবেদনটি শুনতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে অন্য একটি বেঞ্চে আবেদনটি উপস্থাপন করা হলে আদালত শুনানি মুলতবি করেন। এরপর থেকে আবেদনটি আর শুনানির তালিকায় ওঠেনি বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির জামিনের নজির নেই বলে তার জানা। আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা শুনানিতে অংশ নেওয়ার পর তাদের পক্ষ থেকে সময় চাওয়া হলে আদালত শুনানি মুলতবি করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এদিকে, মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের অভিযোগ, ষড়যন্ত্র করে তার মেয়েকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ভূমিকা রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

মোজাম্মেল হোসেন কিশোর জানান, কারা কর্তৃপক্ষ মাসে একবার মেয়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেয়। তার দাবি, মিন্নির শারীরিক অবস্থাও ভালো নয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আদালত তার মেয়েকে জামিন দেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করা এবং মামলা পরিচালনায় সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে মিন্নিকে কাশিমপুর কারাগার থেকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। কারা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে বর্তমানে তিনিই একমাত্র নারী বন্দি।

কারাবিধি অনুযায়ী, কনডেম সেলে থাকা বন্দিদের নির্ধারিত পোশাক দেওয়া হয় এবং তাদের চলাফেরায় কঠোর বিধিনিষেধ থাকে। সাধারণত মাসে একবার স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান তারা। এ ছাড়া নির্ধারিত নিয়ম মেনে সপ্তাহে একবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ রয়েছে।

মিন্নির ক্ষেত্রেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করা ও ফোনে কথা বলার সুযোগ সীমিত বলে কারা সূত্র জানিয়েছে। স্বজনেরা সাক্ষাৎ করতে গেলে তাদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের অধিকাংশ সময় নীরব থাকেন মিন্নি এবং নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। কারাগারে তার আচরণ সন্তোষজনক বলেও জানিয়েছে সূত্রটি।

রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও উচ্চ আদালতের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় মিন্নিসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও আসেনি। মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার আগে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট আপিলের নিষ্পত্তি প্রয়োজন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুদণ্ডের মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগলে বন্দিদের বছরের পর বছর কনডেম সেলে থাকার বিষয়টি মানবাধিকার ও বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তাদের মতে, চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আগে প্রত্যেক আসামির আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পরও উচ্চ আদালতে আসামিরা খালাস পেয়েছেন।

এ কারণে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন আইনসংশ্লিষ্টরা। রিফাত হত্যা মামলায়ও উচ্চ আদালতের শুনানি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন মিন্নি, তার পরিবার এবং আইনজীবীরা।

Advertisements