৯ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ও হার্ট অ্যাটাক: লক্ষণ ও পার্থক্য জানুন

heart-sixteen_nine

হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট—দুটি শব্দ প্রায়ই একই অর্থে ব্যবহার করা হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। উভয় অবস্থাই প্রাণঘাতী হতে পারে, তবে কারণ, লক্ষণ ও তাৎক্ষণিক করণীয় এক নয়। হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদযন্ত্রের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে হৃদযন্ত্র হঠাৎ কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়। তাই এই দুই অবস্থার পার্থক্য জানা জরুরি।

সংগৃহীত

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে শরীরে কী ঘটে?

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলো এমন একটি জরুরি অবস্থা, যখন হৃদযন্ত্র হঠাৎ কার্যকরভাবে রক্ত সঞ্চালন করতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে মস্তিষ্কসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত অল্প সময়ের মধ্যেই অচেতন হয়ে পড়েন এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারেন না।

হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেতের গোলযোগের কারণে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে। এ ছাড়া হার্ট অ্যাটাক, হৃদ্‌যন্ত্রের বিভিন্ন রোগ এবং কিছু বংশগত সমস্যাও এর ঝুঁকি বাড়ায়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্ক ও অন্যান্য অঙ্গের গুরুতর ক্ষতি হতে পারে।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়লে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে দ্রুত জরুরি সহায়তা ডাকতে হবে। প্রশিক্ষণ থাকলে সঙ্গে সঙ্গে সিপিআর (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন) শুরু করা এবং সম্ভব হলে স্বয়ংক্রিয় বহিঃস্থ ডিফিব্রিলেটর (এইডি) ব্যবহার করা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক কেন হয়?

হৃদযন্ত্রের পেশিতে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনিতে বাধা সৃষ্টি হলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। সাধারণত ধমনিতে চর্বি ও অন্যান্য পদার্থ জমে তৈরি হওয়া প্লাক ফেটে রক্ত জমাট বাঁধার কারণে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে হৃদ্‌পেশির কোনো অংশ পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।

হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদযন্ত্র সাধারণত কাজ করতে থাকে, যদিও তার পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে গুরুতর হার্ট অ্যাটাকের কারণে হৃদযন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে কিংবা বিপজ্জনক অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন তৈরি হতে পারে। এর ফলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টও ঘটতে পারে।

Advertisements

হার্ট অ্যাটাকের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে বুকের মাঝখানে চাপ, ব্যথা বা অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব এবং মাথা ঘোরা। ব্যথা বা অস্বস্তি হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় কিংবা চোয়ালেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই লক্ষণ দেখা যায় না। কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে বুকব্যথা ছাড়াও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

দুই অবস্থার প্রধান পার্থক্য

হার্ট অ্যাটাক মূলত হৃদ্‌পেশিতে রক্ত সরবরাহের সমস্যার কারণে হয়। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলো হৃদযন্ত্রের কার্যকর রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া। হার্ট অ্যাটাকের রোগী সচেতন থাকতে পারেন এবং তার বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বিপরীতে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত দ্রুত অচেতন হয়ে পড়েন এবং স্বাভাবিক শ্বাস বন্ধ হয়ে যায় বা কেবল অস্বাভাবিক হাঁপানোর মতো শ্বাস দেখা যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হার্ট অ্যাটাক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ হতে পারে, কিন্তু সব হার্ট অ্যাটাক থেকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় না। আবার হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক গোলযোগসহ অন্য কারণেও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের আগে কি সতর্কসংকেত পাওয়া যায়?

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই সতর্কসংকেত দেখা দিতে পারে। যেমন হাঁটাচলার সময় বুকে চাপ অনুভব করা, অল্প পরিশ্রমেই শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি কিংবা বারবার বুকের অস্বস্তি হওয়া। তবে অনেকের ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট পূর্বলক্ষণ ছাড়াও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়।

অন্যদিকে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট অনেক সময় কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই ঘটে। তবে যাদের হৃদ্‌রোগ, অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন বা বংশগত হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের আগে বুক ধড়ফড়, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।

কখন জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে?

বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম কিংবা হঠাৎ অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। উপসর্গ নিজে থেকে কমে যাওয়ার অপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে।

কেউ হঠাৎ অচেতন হয়ে গেলে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে অবিলম্বে জরুরি সেবায় যোগাযোগ করতে হবে। প্রশিক্ষণ থাকলে সিপিআর শুরু করুন এবং কাছাকাছি এইডি থাকলে সেটির নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট—দুটিই গুরুতর অবস্থা। তবে লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা, সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে প্রাণহানির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

Advertisements