দুর্গাপূজা ২০২৬: কবে কোন অনুষ্ঠান, ঢাকায় ঘুরে দেখুন সেরা ১০ পূজাস্থল

ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ, প্রতিমার সৌন্দর্য আর রঙিন আলোকসজ্জায় আবারও উৎসবমুখর হতে যাচ্ছে রাজধানী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুধু দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবার, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতিরও এক বড় আয়োজন। পূজাকে ঘিরে মন্দির ও মণ্ডপে চলে নানা ধর্মীয় আচার, পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাজধানী ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী মন্দির থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ—সবখানেই উৎসবের আবহ উপভোগ করতে পারেন দর্শনার্থীরা।

২০২৬ সালে ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের ক্ষণগণনা শুরু হচ্ছে। মূল পূজা শুরু হবে ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীতে, আর ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি হবে। তবে ষষ্ঠী ও সপ্তমীর আচার পালনের নির্দিষ্ট দিন পঞ্জিকাভেদে কিছুটা আলাদা হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সংশ্লিষ্ট মন্দির বা পূজা কমিটির সময়সূচি জেনে নেওয়া ভালো।
দুর্গাপূজা ২০২৬: কোন দিন কী অনুষ্ঠান?
১০ অক্টোবর, শনিবার—মহালয়া
মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা এবং দুর্গোৎসবের ক্ষণগণনা শুরু হয়। এদিন প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণে তর্পণ করার রীতি রয়েছে। ভোরে বিভিন্ন মন্দিরে চণ্ডীপাঠ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির ও রমনা কালী মন্দিরে মহালয়া উপলক্ষে অনুষ্ঠানের কথা জানানো হয়েছে।
১৬ অক্টোবর, শুক্রবার—ষষ্ঠী
ষষ্ঠীতে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। কল্পারম্ভ, দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মতো আচার পালিত হয়। বোধনের মধ্য দিয়ে দেবীকে পূজার জন্য আহ্বান জানানো হয়। মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন ও পূজার পরিবেশও এদিন থেকে আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
১৭ ও ১৮ অক্টোবর—সপ্তমীর আচার
সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নান, স্থাপন ও পূজার রীতি রয়েছে। নবপত্রিকা বা কলাবউকে স্নান করিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। ২০২৬ সালে পঞ্জিকাভেদে সপ্তমীর আচার ১৭ অথবা ১৮ অক্টোবর পালিত হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট মণ্ডপের সময়সূচি আগে যাচাই করা প্রয়োজন।
১৯ অক্টোবর, সোমবার—মহাষ্টমী
মহাষ্টমী দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন দেবীর পূজা ও পুষ্পাঞ্জলিতে অংশ নেন ভক্তরা। অনেক স্থানে কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়। অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা, যা দুর্গোৎসবের বিশেষ ধর্মীয় আচারগুলোর একটি। সন্ধিপূজার সঠিক সময় পঞ্জিকা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার—মহানবমী
মহানবমীতে দেবীর পূজা, হোম ও বিশেষ ধর্মীয় আচার পালিত হয়। অনেক মণ্ডপে ভক্তদের জন্য প্রসাদ বিতরণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও থাকে। পূজার শেষ পর্যায়ের এই দিনে মণ্ডপগুলোতে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে পারে।
২১ অক্টোবর, বুধবার—বিজয়া দশমী
বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হয়। এদিন দশমীর পূজা, দেবীবরণ এবং বিভিন্ন স্থানে সিঁদুর খেলার আয়োজন থাকে। এরপর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবীকে বিদায় জানানো হয়। পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও পরিচিতদের মধ্যে বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
তারিখ ও আচার-অনুষ্ঠানের তথ্য: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং ২০২৬ সালের দুর্গাপূজার পঞ্জিকা। ষষ্ঠী ও সপ্তমীর নির্দিষ্ট আচার পঞ্জিকাভেদে ভিন্ন হতে পারে।

ঢাকায় ঘুরে দেখুন পরিচিত ১০টি পূজাস্থল
রাজধানীতে পূজার পরিবেশ, প্রতিমা দর্শন ও ঐতিহ্য উপভোগ করতে চাইলে নিচের স্থানগুলো ভ্রমণতালিকায় রাখতে পারেন। তবে কোনো স্থানে এ বছর বিশেষ প্যান্ডেল, থিম বা আলোকসজ্জার আয়োজন নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
১. ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির
অবস্থান: ঢাকেশ্বরী রোড, বকশীবাজার-পলাশী এলাকা, ঢাকা।
বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী এই মন্দির দুর্গাপূজার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মহালয়া থেকে শুরু করে পূজার বিভিন্ন আচার দেখতে এখানে ভক্তদের সমাগম হয়। ধর্মীয় পরিবেশ ও ঐতিহ্যবাহী আয়োজন উপভোগ করতে চাইলে এটি তালিকার প্রথম দিকেই রাখতে পারেন।
২. রমনা কালী মন্দির
অবস্থান: কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, রমনা এলাকা, ঢাকা।
রমনা কালী মন্দির ঢাকার পরিচিত ধর্মীয় স্থানগুলোর একটি। মহালয়া উপলক্ষে এখানেও অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পূজার সময় মন্দিরকেন্দ্রিক ধর্মীয় পরিবেশ দেখতে আগ্রহীদের জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য গন্তব্য।
৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল
অবস্থান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ঢাকা।
জগন্নাথ হলের উপাসনালয় দুর্গাপূজার জন্য পরিচিত। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে এখানে উৎসবের আলাদা পরিবেশ তৈরি হয়। পূজার পাশাপাশি ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক আবহ উপভোগ করতে চাইলে জায়গাটি ঘুরে দেখতে পারেন।
৪. বনানী খেলার মাঠের পূজামণ্ডপ
অবস্থান: বনানী খেলার মাঠ, বনানী, ঢাকা।
বনানীর অস্থায়ী পূজামণ্ডপ আগের বছরগুলোতে বড় প্যান্ডেল, প্রতিমা ও বর্ণিল আলোকসজ্জার জন্য পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সাজসজ্জা দেখতে দর্শনার্থীরা এখানে যেতে পারেন। তবে ২০২৬ সালের প্যান্ডেলের নকশা ও আয়োজন সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পেতে স্থানীয় পূজা কমিটির ঘোষণা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
৫. শাঁখারীবাজারের পূজামণ্ডপ
অবস্থান: শাঁখারীবাজার, পুরান ঢাকা।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এই এলাকায় দুর্গাপূজাকে ঘিরে স্থানীয় উৎসবের আবহ তৈরি হয়। পুরোনো বাড়িঘর, সরু গলি ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পূজার পরিবেশ দেখতে চাইলে শাঁখারীবাজার ঘুরে দেখতে পারেন। তবে ভিড়ের কারণে হাঁটাচলায় সতর্ক থাকা জরুরি।
৬. তাঁতীবাজারের পূজামণ্ডপ
অবস্থান: তাঁতীবাজার, পুরান ঢাকা।
তাঁতীবাজার পুরান ঢাকার পরিচিত এলাকা। পূজার সময়ে স্থানীয় মণ্ডপ ও উৎসবের পরিবেশ উপভোগ করার জন্য এটি ভ্রমণতালিকায় রাখা যায়। শাঁখারীবাজারের সঙ্গে একই দিনে এই এলাকা ঘুরে দেখার পরিকল্পনা করলে যাতায়াতের সময়ও বাঁচতে পারে।
৭. সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির
অবস্থান: সিদ্ধেশ্বরী লেন, মৌচাক এলাকার কাছে, ঢাকা।
সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির রাজধানীর পরিচিত মন্দিরগুলোর একটি। পূজার ধর্মীয় পরিবেশ ও প্রতিমা দর্শনের জন্য এখানে যেতে পারেন। এ বছরের দুর্গাপূজার বিশেষ আয়োজন, দর্শনার্থীদের প্রবেশব্যবস্থা ও সময়সূচি আগে নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।
৮. জয়কালী মন্দির
অবস্থান: গুলিস্তান রোড, পুরান ঢাকা।
জয়কালী মন্দির ঢাকার পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর মধ্যে পরিচিত। পুরান ঢাকার অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী এলাকা ঘোরার সঙ্গে এই মন্দিরও ভ্রমণতালিকায় রাখা যায়। তবে দুর্গাপূজার নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান ও বিশেষ সাজসজ্জা সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন।
৯. রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন
অবস্থান: ঢাকা শহর।
রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন ধর্মীয় আচার ও আধ্যাত্মিক কার্যক্রমের জন্য পরিচিত। দুর্গাপূজার সময় বিশেষ অনুষ্ঠান দেখতে আগ্রহীরা এ স্থান সম্পর্কে খোঁজ নিতে পারেন। তবে ২০২৬ সালে কোন কোন অনুষ্ঠান, বিশেষ করে কুমারী পূজা, কখন অনুষ্ঠিত হবে—তা আয়োজকদের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
১০. স্বামীবাগের ইসকন মন্দির
অবস্থান: ৭৯ স্বামীবাগ রোড, স্বামীবাগ, ঢাকা।
স্বামীবাগের ইসকন মন্দির ঢাকার পরিচিত ধর্মীয় স্থানগুলোর একটি। মন্দিরের ধর্মীয় পরিবেশ ও চলমান অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানতে সেখানে যোগাযোগ করা যেতে পারে। তবে এটি দুর্গাপূজার নির্দিষ্ট মণ্ডপ হিসেবে ২০২৬ সালে অংশ নিচ্ছে—এমন নিশ্চিত তথ্য ছাড়া একে দুর্গাপূজার বিশেষ প্যান্ডেল হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
পূজা দেখতে যাওয়ার আগে যা মনে রাখবেন
দুর্গাপূজার দিনগুলোতে ঢাকার বিভিন্ন সড়ক ও মণ্ডপ এলাকায় যানজট এবং দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে পারে। তাই সম্ভব হলে গণপরিবহন ব্যবহার করুন এবং বের হওয়ার আগে যাতায়াতের পথ পরিকল্পনা করে নিন। বিশেষ পূজা, পুষ্পাঞ্জলি, সন্ধিপূজা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট মণ্ডপের সময়সূচি জেনে যান।
প্যান্ডেল ও আলোকসজ্জা দেখতে যাওয়ার আগে এ বছরের আয়োজনের ছবি বা ঘোষণা দেখে নেওয়া ভালো। একইভাবে, মণ্ডপে প্রবেশের নিয়ম, ছবি তোলার অনুমতি এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলুন।
দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও উৎসব। রাজধানীর পরিচিত পূজাস্থলগুলো ঘুরে দেখার মধ্য দিয়ে দর্শনার্থীরা যেমন উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারবেন, তেমনি জানতে পারবেন ঢাকার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নানা দিক।



