২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

নেইল পলিশ ছাড়াই নখ সাজানোই কি এখন নতুন ট্রেন্ড?

IMG_5364

নখ সাজাতে একসময় রঙ, নেইল আর্ট ও নানা ধরনের কারুকাজের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে উল্টো পরিবর্তন। নেইল পলিশ বা কোনো রঙ ব্যবহার না করে পরিষ্কার, ছাঁটা ও স্বাভাবিক নখ রাখার প্রবণতা জনপ্রিয় হচ্ছে। ফ্যাশন দুনিয়ায় ‘বেয়ার নেইলস’ নামে পরিচিত এই স্টাইলকে অনেকে ‘নীরব আভিজাত্য’র নতুন প্রতীক হিসেবেও দেখছেন।

লন্ডনের একটি স্পার মালিক পালোমা বুদেমায়ারের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক গ্রাহক নখ কেটে, ঘষে মসৃণ করে এবং কিউটিকল পরিষ্কার ও ময়েশ্চারাইজ করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো নেইল পলিশ ব্যবহার করছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফ্যাশন র‍্যাম্প ও তারকাদের উপস্থিতির মাধ্যমে স্বাভাবিক নখের এই স্টাইল আরও আলোচনায় এসেছে।

তবে এই প্রবণতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। সমালোচকদের মতে, রঙিন বা নকশা করা নখকে ‘অরুচিকর’ এবং স্বাভাবিক নখকে ‘রুচিশীল’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সৌন্দর্য ও সামাজিক শ্রেণি নিয়ে পুরনো ধারণাই নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

সাংবাদিক ক্রিস্টিনা রোদুলফোর মতে, নেইল আর্টের শিকড় কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো ও এশীয় সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে বৈচিত্র্যময় নেইল আর্টকে পাশ কাটিয়ে সাধারণ নখকে উচ্চবিত্ত বা অভিজাত রুচির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা সংস্কৃতি ও পরিচয়কে আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অবশ্য অনেকের কাছে বিষয়টি শ্রেণির চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ ও জীবনযাপনের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। আইরিশ টেলিভিশন উপস্থাপক অ্যাঞ্জেলা স্ক্যানলন বছরের পর বছর নিয়মিত ম্যানিকিউর করালেও ব্যস্ততা ও সময়ের চাপের কারণে একপর্যায়ে সেই অভ্যাস ছেড়ে দেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানালে অনেকে তাকে সমর্থন করেন এবং একইভাবে নেইল পলিশ ছাড়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

জীবনযাত্রার ব্যয়ও এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হতে পারে। নিয়মিত ম্যানিকিউর, নেইল পলিশ ও নেইল আর্টে অর্থ ও সময় দুটোই ব্যয় হয়। কেউ খরচ কমাতে, কেউ ব্যায়াম বা দৈনন্দিন কাজের সময় নখ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে আবার কেউ শুধুই স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নেইল পলিশ ব্যবহার বন্ধ করছেন।

Advertisements

নেইল আর্টের ইতিহাসেও আছে শ্রেণির ছাপ

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, কৃত্রিম ও আকর্ষণীয় নেইল আর্ট জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিন ও এশীয় জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অলিম্পিকজয়ী ফ্লোরেন্স গ্রিফিথ-জয়নার ও সংগীতশিল্পী ডায়ানা রসের মতো তারকারা নেইল আর্টকে নিজেদের সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আবার সত্তরের দশকে ভিয়েতনামি শরণার্থীদের মাধ্যমে নেইল বার জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর সাধারণ মানুষের কাছেও নেইল পলিশ ও ম্যানিকিউর আরও সহজলভ্য হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি রূপচর্চা সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠলে উচ্চবিত্ত শ্রেণি অনেক সময় নতুন কোনো সৌন্দর্যের প্রতীক খুঁজে নেয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কৃত্রিম নখ বা গাঢ় রঙকে ‘অমার্জিত’ এবং বেয়ার নেইলসকে ‘আভিজাত্যপূর্ণ’ হিসেবে দেখার প্রবণতাকেও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

তবে মজার বিষয় হলো, বাইরে থেকে একেবারে স্বাভাবিক মনে হলেও বেয়ার নেইলস সবসময় পরিচর্যাহীন নয়। নখকে পলিশ ছাড়াই মসৃণ, পরিষ্কার ও চকচকে রাখতে অনেকেই নিয়মিত পার্লারে গিয়ে ম্যানিকিউর করাচ্ছেন। এমনকি জেনডায়া বা জো ক্রাভিজের মতো তারকাদের স্বাভাবিক নখের স্টাইল অনুসরণ করতে কৃত্রিম উপায়ে একই ধরনের লুক তৈরি করছেন অনেকে।

নখের সঙ্গে সামাজিক মর্যাদার সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। ত্রয়োদশ শতকের চীনে দীর্ঘ নখ রাখা ছিল কায়িক শ্রম থেকে মুক্ত থাকার একটি প্রতীক। বড় নখের মাধ্যমে বোঝানো হতো যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শ্রমজীবী নন এবং তিনি ধনী বা প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য।

আবার উনিশ শতকের দিকে নারীর নখের পরিচর্যাকে তার পরিচ্ছন্নতা, আচার-ব্যবহার ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গেও যুক্ত করা হতো। স্বাভাবিক ও পরিষ্কার নখকে রুচিশীলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হলেও অতিরিক্ত বা গাঢ় নেইল পলিশ অনেক সময় অহংকার, প্রদর্শনেচ্ছা কিংবা কৃত্রিমতার সঙ্গে যুক্ত করা হতো।

বর্তমানেও তাই প্রশ্ন উঠছে—নখে নেইল পলিশ থাকবে কি না, সেটি কি শুধুই ব্যক্তিগত পছন্দ, নাকি এর মধ্যেও সামাজিক রুচি ও শ্রেণির ধারণা কাজ করছে?

বিশ্লেষকদের মতে, একজন ব্যক্তি নখে গাঢ় রঙ ব্যবহার করবেন, নেইল আর্ট করবেন নাকি একেবারে স্বাভাবিক রাখবেন—সেটি তার ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। কোনো একটি স্টাইলকে সামাজিক মর্যাদা বা ‘মার্জিত রুচি’র একমাত্র মাপকাঠি বানানোর প্রয়োজন নেই।

শেষ পর্যন্ত বেয়ার নেইলসের জনপ্রিয়তা হয়তো নেইল পলিশের পুরোপুরি বিদায় নয়; বরং সৌন্দর্যচর্চায় ব্যক্তিগত পছন্দের আরও একটি নতুন প্রবণতা। কেউ নেইল আর্ট পছন্দ করেন, কেউ স্বাভাবিক নখ। ফ্যাশনের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই পছন্দও বদলাতে পারে।

Advertisements