২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ৮ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

শৈশবের নিঃসঙ্গতার ছাপ থেকে যেতে পারে বার্ধক্যের স্মৃতিতে

WhatsApp Image 2026-09-16 at 6.05.34 PM

শৈশব মানেই খেলাধুলা, বন্ধুত্ব, হাসি আর নানা রকমের কৌতূহলে ভরা দিন। কিন্তু সবার শৈশব একরকম নয়। কেউ কেউ ছোটবেলাতেই নিজেকে আবিষ্কার করে এক গভীর নিঃসঙ্গতার মধ্যে—বন্ধু নেই, মনের কথা বলার মানুষ নেই, কিংবা পরিবারের কাছেও নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশের সুযোগ নেই। বাইরে থেকে শান্ত ও স্বাভাবিক মনে হলেও এমন শৈশব মনের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলতে পারে।

নতুন এক গবেষণা বলছে, সেই প্রভাব শুধু শৈশব বা কৈশোরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে বার্ধক্যেও এর প্রভাব দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতার ওপর শৈশবের একাকিত্বের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকার ইঙ্গিত পেয়েছেন গবেষকেরা।

বেইজিংয়ের ক্যাপিটাল মেডিকেল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা সাত বছর ধরে ১৩ হাজার ৫৯২ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণায় ১৭ বছর বয়সের আগের সময়কে শৈশব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শৈশবে দীর্ঘদিন একাকিত্বে থাকা ব্যক্তিদের পরবর্তী জীবনে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি হতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী জেএএমএ নেটওয়ার্ক ওপেনে।

একাকিত্বের প্রভাব কতটা গভীর?

শৈশবে একাকিত্বে ভোগা মানুষের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানীয় সক্ষমতা বা কগনিটিভ ফাংশন কমে যাওয়ার প্রবণতাও বেশি দেখা গেছে। স্মৃতি ধরে রাখা, ভাষা ব্যবহার, যুক্তি প্রয়োগ কিংবা নতুন তথ্য শেখার মতো মস্তিষ্কনির্ভর কাজগুলোতে সময়ের সঙ্গে তাদের সক্ষমতা দ্রুত কমতে পারে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিল ৫৮ বছর। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পরবর্তী জীবনে কারও একাকিত্বের অনুভূতি কমে গেলেও শৈশবের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতার সম্পর্ক পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।

অর্থাৎ, ছোটবেলার নিঃসঙ্গতা শুধু সেই সময়ের মন খারাপ বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বিষয় নয়। দীর্ঘদিনের এমন অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের বিকাশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

Advertisements

কেন শৈশবের একাকিত্ব এত গুরুত্বপূর্ণ?

শৈশব মস্তিষ্কের বিকাশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়। এ সময়ে সামাজিক যোগাযোগ, বন্ধুত্ব, খেলাধুলা ও পারিবারিক সম্পর্ক শিশুর মানসিক ও জ্ঞানীয় বিকাশে ভূমিকা রাখে। এর বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব শিশুর মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। গবেষকদের ধারণা, দীর্ঘদিনের এই মানসিক চাপ মস্তিষ্কের কিছু কাঠামোগত ও কার্যগত পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। পরবর্তী জীবনে এসব পরিবর্তন ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমারের মতো স্নায়ুবিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—গবেষণাটি শৈশবের একাকিত্ব এবং পরবর্তী জীবনের ডিমেনশিয়ার মধ্যে একটি সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে শৈশবে একাকী থাকা প্রত্যেক ব্যক্তিই ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হবেন।

স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া আর ডিমেনশিয়া এক নয়

বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু বিষয় ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। কারও নাম মনে করতে একটু সময় লাগা, কোথায় কোনো জিনিস রাখা হয়েছে তা সাময়িকভাবে ভুলে যাওয়া কিংবা কোনো তথ্য মনে করতে দেরি হওয়া বয়সজনিত স্বাভাবিক পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। ডিমেনশিয়া তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর। এ ক্ষেত্রে স্মৃতি, চিন্তা, ভাষা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রোগের অগ্রগতির সঙ্গে একজন মানুষ পরিচিত মানুষ, জায়গা কিংবা নিজের পরিচয়ও ভুলে যেতে পারেন। গবেষণার ফলাফল তাই শৈশবের সামাজিক ও মানসিক পরিবেশকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

শিশুর একাকিত্বকে অবহেলা নয়

কোনো শিশু যদি দীর্ঘ সময় একা থাকে, বন্ধু তৈরি করতে না পারে কিংবা অন্যদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখে, সেটিকে শুধুই ‘শান্ত স্বভাব’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। তার সঙ্গে কথা বলা, তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

স্কুলে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ, খেলাধুলার সুযোগ এবং সহপাঠীদের সঙ্গে সুস্থভাবে মেশার সুযোগ শিশুর সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে পরিবারেও শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা প্রয়োজন। কিশোর-কিশোরীরা যখন নিজেদের নিঃসঙ্গতা, মন খারাপ বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কথা জানায়, তখন সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শও নেওয়া যেতে পারে।

ডিমেনশিয়ার সব কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি এবং এর নিশ্চিত নিরাময়ও নেই। তাই ঝুঁকি কমাতে জীবনযাপন, সামাজিক যোগাযোগ এবং মানসিক সুস্থতার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একটি শিশুর আজকের নিঃসঙ্গতা যে আগামী দিনের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে—এই গবেষণা সেই বিষয়টিই আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

Advertisements