৯ নভেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ২৪ কার্তিক ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

অন্যের শিশুকে বুকের দুধ দিতে পারবেন যেকোনো মা? জেনে নিন জরুরি সতর্কতা

Breastfeeding-research-1440×720

জন্মের পর শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশে মায়ের দুধের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু কোনো কারণে শিশু নিজের মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত হলে কী হবে? এমন পরিস্থিতিতে অন্য মায়ের বুকের দুধ হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। তবে ইচ্ছা করলেই কি যেকোনো মা অন্যের শিশুকে দুধ দিতে পারবেন? এ ক্ষেত্রে রয়েছে কিছু স্বাস্থ্যগত সতর্কতা, সংক্রমণের ঝুঁকি এবং প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন।

মায়ের দুধ শিশুর প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুর জন্য শুধু মায়ের দুধই যথেষ্ট। এরপর অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি দুই বছর বা তার বেশি সময় পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু মায়ের মৃত্যু, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো কারণে শিশু নিজের মায়ের দুধ না পেলে তার পুষ্টির ব্যবস্থা কীভাবে হবে?

ছবি:সংগৃহীত

এমন পরিস্থিতিতে অন্য একজন মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্য কার্যকর বিকল্প হতে পারে। বিশেষ করে অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ প্রয়োজন মেটাতে মাতৃদুগ্ধ ব্যাংকও রয়েছে, যেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষিত ও প্রক্রিয়াজাত দুধ সংগ্রহ করা যায়। সম্প্রতি মায়ের মৃত্যুর পর একটি শিশুর জন্য ‘দুধ-মা’ খোঁজার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অন্য মায়ের দুধ শিশুকে খাওয়ানোর আগে কী কী বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন, তা জানা জরুরি।

অন্যের শিশুকে দুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে কী কী বিষয় জরুরি?

এ বিষয়ে স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. আনিকা তাবাস্‌সুম জানান, অন্যের শিশুকে বুকের দুধ দেওয়ার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে মানবিক। তবে শিশুর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কিছু স্বাস্থ্যগত বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রথমেই দেখতে হবে, যিনি দুধ দিচ্ছেন তার নিজের সন্তান পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে কি না। অন্য শিশুকে দুধ দিতে গিয়ে নিজের সন্তান যেন পুষ্টি থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

Advertisements

এ ছাড়া দুধ দানকারী মায়ের শারীরিক অবস্থা, সংক্রমণের ঝুঁকি, ওষুধ সেবন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

যেসব সংক্রমণ থেকে সতর্ক থাকতে হবে

অন্যের শিশুকে বুকের দুধ দেওয়ার আগে মায়ের কিছু সংক্রামক রোগের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—

এইচআইভি: এই ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় রাখা জরুরি।

হেপাটাইটিস বি ও সি: দুধ দানকারী মায়ের সংক্রমণের অবস্থা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে।

হিউম্যান টি-সেল লিম্ফোট্রপিক ভাইরাস: এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সিফিলিস: অনেক সময় দৃশ্যমান উপসর্গ না থাকলেও সংক্রমণ থাকতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা জরুরি।

হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস: স্তনে হারপিসের ক্ষত থাকলে বিশেষ সতর্কতা
প্রয়োজন। একটি স্তনে ক্ষত থাকলেও অন্য স্তনে সংক্রমণ না থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেখান থেকে দুধ নেওয়া যেতে পারে।

ব্রুসেলা: জ্বর, শরীর ব্যথাসহ সাধারণ কিছু উপসর্গের মাধ্যমে এ সংক্রমণ প্রকাশ পেতে পারে।

মাঙ্কিপক্স ও ইবোলা: এসব ভাইরাসের সংক্রমণ থাকলেও দুধ দেওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন।

আরও যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন

শুধু সংক্রামক রোগ নয়, দুধ দানকারী মায়ের জীবনযাপন ও ওষুধ সেবনের বিষয়টিও শিশুর নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।

-মা ধূমপান বা তামাকজাত পণ্য ব্যবহার করলে তা শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
-অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের অভ্যাস থাকলেও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
-কোনো রেডিওঅ্যাকটিভ পদার্থ গ্রহণ বা নির্দিষ্ট চিকিৎসার কারণে শরীরে এমন পদার্থের উপস্থিতি তৈরি হলে তা বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
-সম্প্রতি কোনো ওষুধ, সাপ্লিমেন্ট কিংবা হারবাল উপাদান গ্রহণ করেছেন কি না, সেটিও চিকিৎসককে জানাতে হবে।

দুধ দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ কেন জরুরি?

ছবি:সংগৃহীত

অন্যের শিশুকে বুকের দুধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু পরীক্ষা করাতে পারেন। কোনো সংক্রামক রোগ থাকলে কত দিন পর দুধ দেওয়া নিরাপদ হবে, কিংবা আদৌ দেওয়া যাবে কি না, তা নির্ধারণ করবেন তিনি। এ ছাড়া দুধ দানকারী মা সম্প্রতি কী ধরনের ওষুধ গ্রহণ করেছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কিছু ওষুধ বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই চিকিৎসকের কাছে সব তথ্য স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন।

বুকের দুধ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করবেন যেভাবে

মাতৃদুগ্ধ ব্যাংকে সাধারণত সংগৃহীত দুধ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় পাস্তুরাইজ করা হয়, যাতে জীবাণুর ঝুঁকি কমানো যায়। তবে আমাদের দেশে এ ধরনের সুবিধা সহজলভ্য নয়। তাই অন্য মায়ের দুধ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

দুধ সংগ্রহের সময়:

-প্রতিবার দুধ সংগ্রহের আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে।
-দুধ সংগ্রহের পাম্প ও অন্যান্য সরঞ্জাম যথাযথভাবে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে।
-দুধ রাখার জন্য পরিষ্কার, নিরাপদ ও উপযুক্ত পাত্র ব্যবহার করতে হবে।
পাত্রের গায়ে দুধ সংগ্রহের তারিখ ও সময় লিখে রাখা ভালো।

ফ্রিজে রাখা দুধ শিশুকে খাওয়াবেন যেভাবে

-সংরক্ষিত বুকের দুধ শিশুকে খাওয়ানোর আগে সঠিকভাবে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মেনে চলুন।

-ফ্রিজে রাখা দুধের বোতল একটি পাত্রে ঈষদুষ্ণ পানি নিয়ে তার মধ্যে রেখে ধীরে ধীরে গরম করুন।

-কখনোই সরাসরি চুলায় বা মাইক্রোওয়েভ ওভেনে বুকের দুধ গরম করবেন না। এতে দুধের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নষ্ট হতে পারে এবং অসমভাবে গরম হয়ে শিশুর মুখ পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

-ডিপ ফ্রিজে রাখা দুধ প্রথমে সাধারণ ফ্রিজে রেখে গলিয়ে নেওয়া যায়।
সম্পূর্ণ গলে যাওয়ার পর দুধ ফ্রিজে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা রাখা যায়। তবে একবার গলে যাওয়া দুধ পুনরায় ডিপ ফ্রিজে রাখা যাবে না।

-স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনার পর দুই ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে সেই দুধ খাওয়াতে হবে।

-অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া নবজাতকের ক্ষেত্রে দুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও খাওয়ানোর বিষয়ে চিকিৎসক বিশেষ নির্দেশনা দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শই অনুসরণ করতে হবে।

মানবিক উদ্যোগের পাশাপাশি চাই নিরাপত্তা

একজন মা অন্যের শিশুকে বুকের দুধ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করতে পারেন। এটি নিঃসন্দেহে মানবিক ও মহৎ উদ্যোগ। তবে শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে শুধু দুধের ব্যবস্থা করলেই হবে না, দুধ দানকারী মায়ের স্বাস্থ্য এবং দুধের নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সঠিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে দুধ সংগ্রহ এবং যথাযথ সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করলেই এ উদ্যোগকে আরও নিরাপদ করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, শিশুর পুষ্টির পাশাপাশি তার স্বাস্থ্য সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisements