১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ৩ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

নস্টালজিয়া মার্কেটিং: অতীতের অনুভূতিতে বর্তমানের ব্যবসা

nostalgia-in-marketing-1-jpg

একটি পুরনো জিঙ্গেল বাজলেই হঠাৎ মনে পড়ে যেতে পারে শৈশবের কোনো বিকেল। বহু বছর পর পরিচিত কোনো প্যাকেট চোখে পড়লে মনে পড়ে যেতে পারে পরিবারের সঙ্গে কাটানো কোনো সময়। বিজ্ঞাপন হয়তো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের, কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডই খুলে দিতে পারে বহু বছরের পুরনো স্মৃতির দরজা। আর মানুষের এই স্মৃতির সঙ্গে সংযোগ তৈরির কৌশলই এখন মার্কেটিংয়ের অন্যতম আলোচিত পদ্ধতি—নস্টালজিয়া মার্কেটিং।

অতীতের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা

মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় থাকে, যেগুলো বাস্তবে আর ফিরে আসে না। স্কুল ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঈদের নতুন জামা, পরিবারের সঙ্গে টেলিভিশনের সামনে বসা কিংবা প্রিয় কোনো অনুষ্ঠানের অপেক্ষা—সময় এগিয়ে গেলেও এসব মুহূর্তের স্মৃতি থেকে যায়।

নস্টালজিয়া মূলত সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতি এক ধরনের আবেগময় টান। মার্কেটিংয়ের ভাষায়, এই আবেগকে ব্যবহার করে কোনো ব্র্যান্ড যখন বর্তমানের পণ্যের সঙ্গে অতীতের স্মৃতিকে যুক্ত করে, তখন সেটিই হয়ে ওঠে নস্টালজিয়া মার্কেটিং।

পণ্যের আগে আসে গল্প

একটি বিজ্ঞাপনে একটি পণ্যের বৈশিষ্ট্য, দাম কিংবা ব্যবহারবিধি বলা যেতে পারে। কিন্তু নস্টালজিয়া-ভিত্তিক বিজ্ঞাপনে অনেক সময় এসবের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় গল্প।

পুরনো একটি গান, পরিচিত একটি চরিত্র কিংবা বহুদিন আগের বিজ্ঞাপনের দৃশ্যই দর্শকের মনে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে—‘এটা কি সেই আগের জিনিস?’

সেখান থেকেই শুরু হয় ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে ব্র্যান্ডের যোগাযোগ।

Advertisements

অর্থাৎ ব্র্যান্ড তখন শুধু বলছে না, ‘আমাদের পণ্য কিনুন।’ বরং বলছে, ‘আপনার পরিচিত সেই সময়টাকে কি মনে আছে?’

কেন স্মৃতির ওপর এত জোর?

নস্টালজিয়ার একটি বড় শক্তি হলো পরিচিতি। নতুন কোনো ব্র্যান্ডকে মানুষকে প্রথমে চিনতে হয়, তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। কিন্তু বহুদিনের পরিচিত কোনো ব্র্যান্ড বা প্রতীক মানুষের কাছে আগে থেকেই একটি মানসিক পরিচিতি তৈরি করে রাখতে পারে।

একটি পুরনো লোগো, প্যাকেট কিংবা বিজ্ঞাপনের সুর তাই নতুন করে সামনে এলে সেটি শুধু একটি ডিজাইন বা শব্দ হিসেবে ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে যুক্ত পুরনো অভিজ্ঞতাও মনে পড়ে যেতে পারে।

এ কারণে নস্টালজিয়া ব্র্যান্ডের যোগাযোগকে পণ্যের তথ্যের বাইরে নিয়ে গিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করে।

নব্বইয়ের দশক থেকে শৈশব—সবই এখন মার্কেটিংয়ের উপকরণ

বর্তমান বিজ্ঞাপনে বিভিন্ন দশকের সংস্কৃতি ও জনপ্রিয় উপাদানের ব্যবহার চোখে পড়ছে। পুরনো দিনের পোশাক, রঙ, গান, খেলনা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান কিংবা বিজ্ঞাপনের ভাষা—সবকিছুই নতুন প্রচারণায় ফিরে আসতে পারে।

বিশেষ করে নব্বইয়ের দশক বা ২০০০-এর শুরুর সময়কে ঘিরে তৈরি কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহজেই মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে মিশে যায়।

একজন দর্শকের কাছে এটি হতে পারে শৈশবের স্মৃতি, অন্যজনের কাছে কৈশোরের। ফলে একই বিজ্ঞাপন ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন গল্প তৈরি করতে পারে।

পুরনোকে ফিরিয়ে এনে নতুন করে বলা

তবে নস্টালজিয়া মার্কেটিং মানেই অতীতকে হুবহু পুনরায় তৈরি করা নয়।

বরং কার্যকর প্রচারণায় পুরনো কোনো উপাদানকে বর্তমানের গল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পুরনো চরিত্র ফিরে আসতে পারে নতুন পরিস্থিতিতে, বহুদিনের পরিচিত পণ্য পেতে পারে নতুন প্যাকেজিং, কিংবা পুরনো কোনো গান নতুন প্রজন্মের উপযোগী করে ব্যবহার করা হতে পারে।

এভাবে অতীত হয়ে ওঠে বর্তমানের গল্প বলার একটি মাধ্যম।

বাংলাদেশেও বদলাচ্ছে বিজ্ঞাপনের ভাষা

বাংলাদেশের বাজারেও বিজ্ঞাপনে স্মৃতি ও আবেগের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। পুরনো দিনের জনপ্রিয় জিঙ্গেল, পরিচিত প্যাকেজিং, তারকা বা চরিত্রকে নতুন প্রচারণায় ফিরিয়ে আনার প্রবণতা ভোক্তার সঙ্গে দ্রুত সংযোগ তৈরির একটি কৌশল হিসেবে দেখা যায়।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এমন প্রচারণা আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। একটি পুরনো বিজ্ঞাপন বা চরিত্র নতুন করে সামনে এলে দর্শক শুধু সেটি দেখেই থেমে থাকে না; অনেক সময় নিজের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা কিংবা পুরনো ছবিও শেয়ার করে।

ফলে বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়।

ডিজিটাল যুগে স্মৃতির নতুন ঠিকানা

আগে নস্টালজিয়া-ভিত্তিক বিজ্ঞাপনের প্রধান মাধ্যম ছিল টেলিভিশন, রেডিও ও প্রিন্ট মিডিয়া। এখন সেই জায়গায় যুক্ত হয়েছে Facebook, YouTube, TikTok, Instagramসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।

ডিজিটাল মাধ্যমের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—দর্শক নিজেই কনটেন্ট ছড়িয়ে দিতে পারে।

কেউ পুরনো বিজ্ঞাপনের ভিডিও শেয়ার করছে, কেউ কমেন্টে লিখছে তার শৈশবের গল্প, আবার কেউ বন্ধুকে ট্যাগ করে বলছে—‘মনে আছে?’

এই ‘মনে আছে?’ প্রশ্নটিই অনেক সময় নস্টালজিয়া মার্কেটিংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হয়ে ওঠে।

স্মৃতি কি সবসময় বিক্রি বাড়ায়?

নস্টালজিয়া আবেগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু শুধু আবেগ তৈরি করলেই একটি প্রচারণা সফল হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

পুরনো কোনো উপাদানকে বর্তমানের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে যুক্ত করতে না পারলে সেটি কেবল অতীতের একটি স্মৃতি হিসেবেই থেকে যেতে পারে। আবার অতিরিক্তভাবে আবেগ ব্যবহার করলে দর্শকের কাছে প্রচারণাটি কৃত্রিমও মনে হতে পারে।

তাই নস্টালজিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো—স্মৃতিকে জাগানো এবং সেই স্মৃতির সঙ্গে বর্তমান পণ্যের একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করা।

ব্র্যান্ড যখন স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে

একটি ব্র্যান্ডের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সবসময় তার পণ্য বা লোগো নয়। দীর্ঘদিনের ব্যবহারকারীর জীবনের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।

যে পণ্যটি কেউ ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে, যে খাবারটি পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে খেয়েছে কিংবা যে বিজ্ঞাপনটি নিয়মিত টেলিভিশনে দেখেছে—সেগুলো সময়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে যেতে পারে।

নস্টালজিয়া মার্কেটিং সেই পুরনো সম্পর্কটিকেই আবার সামনে আনে।

অতীতের গল্প, বর্তমানের বাজার

আজকের ভোক্তা শুধু পণ্য কিনছে না; সে অভিজ্ঞতা, পরিচিতি ও অনুভূতির সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরি করছে। আর এখানেই নস্টালজিয়া মার্কেটিংয়ের জায়গাটি আলাদা।

প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, মানুষের স্মৃতির প্রয়োজন পুরনো হয় না। বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনে পরিচিত কিছু মুহূর্ত মানুষকে সাময়িকভাবে ফিরিয়ে নিয়ে যায় নিজের চেনা জগতে।

ব্যবসা সেই অনুভূতির জায়গাটিকেই এখন নতুনভাবে ব্যবহার করছে।

শেষ পর্যন্ত নস্টালজিয়া মার্কেটিংয়ের গল্পটা হয়তো খুব সহজ—মানুষকে নতুন কিছু কেনানোর আগে তার পুরনো কোনো গল্প মনে করিয়ে দেওয়া। কারণ কোনো ব্র্যান্ড যখন মানুষের নিজের জীবনের একটি স্মৃতির সঙ্গে জায়গা করে নিতে পারে, তখন সেটি আর শুধু বাজারের একটি পণ্য থাকে না; হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত গল্পের একটি অংশ।

Advertisements