১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
বিবিধ

প্রেমিকার পেছনে খরচ ৪ কোটি ৫৬ লাখ, ব্রেকআপের পর যা করলেন প্রেমিক

IMG_036f6ef4-fcff-489c-860d-cb9301b06a4a

প্রেমের সম্পর্কের সময় উপহার, বিদেশ ভ্রমণ, জীবনবিমা কিংবা প্রিয় মানুষের নানা প্রয়োজন মেটাতে অর্থ খরচ করা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর যদি প্রশ্ন ওঠে—‘খরচ করা সেই টাকা কি ফেরত পাওয়া যাবে?’ তখন বিষয়টি আর শুধু আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, গড়ায় আদালত পর্যন্ত।

সিঙ্গাপুরে এমনই এক ঘটনা ঘটেছে। প্রেমিকার পেছনে প্রায় ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা খরচ করার পর সম্পর্ক ভেঙে গেলে সেই অর্থ ফেরত চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন এক ব্যবসায়ী। তবে আদালত তার দাবি গ্রহণ করেননি। বিচারকের মতে, ওই অর্থ তিনি স্বেচ্ছায় খরচ করেছিলেন এবং এগুলো যে ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, তার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি।

মামলার বাদী চন্দর আগরওয়াল একটি লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ২০১৯ সালে একটি ফ্লাইটে সাবেক ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ফেলিসিয়া লির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। কয়েক বছর পর, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সম্পর্ক টিকে ছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এই সময়ে আগরওয়াল প্রেমিকার জন্য বেশ বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন। আদালতে তিনি দাবি করেন, এর একটি অংশ ছিল ফেলিসিয়ার নেওয়া সুদমুক্ত ঋণ। সব মিলিয়ে তার খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬৮ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা

এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের খরচ বাবদ ছিল ২ লাখ ৬ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার। বিদেশ ভ্রমণে খরচ হয় আরও ১ লাখ ২৯ হাজার ডলার। প্রেমিকার অ্যাপার্টমেন্টের জন্য ফেংশুই বিশেষজ্ঞ নিয়োগে ব্যয় করেন ১৭ হাজার ডলার। এ ছাড়া জীবনবিমার প্রিমিয়াম বাবদও দেন ২০ হাজার ডলার। কিন্তু ফেলিসিয়ার বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার দাবি, এসব অর্থ তিনি কখনো ঋণ হিসেবে নেননি। বরং সম্পর্কের সময়ে ভালোবাসা ও যত্নের অংশ হিসেবেই আগরওয়াল এসব অর্থ খরচ করেছিলেন।

২০২৪ সালের মার্চে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। আগরওয়াল দাবি করেন, সম্পর্ক চলাকালে দেওয়া অর্থ তাকে ফেরত দেওয়া উচিত। তবে সিঙ্গাপুরের হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারক লি সিউ কিন তার সেই দাবি নাকচ করে দেন।

আদালত দেখতে পায়, কথিত ঋণের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আগরওয়াল উপস্থাপন করতে পারেননি। এমন কোনো স্বীকৃতিও তিনি দেখাতে পারেননি, যেখানে ফেলিসিয়া স্বীকার করেছেন যে তিনি ওই অর্থ ঋণ হিসেবে নিয়েছিলেন। বরং আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে অন্য একটি চিত্র। সম্পর্কের সময় আগরওয়ালের মধ্যে প্রেমিকার জন্য দামি উপহার ও অর্থ ব্যয়ের ধারাবাহিক প্রবণতা ছিল। এমনকি সম্পর্ক শুরুর আগেও তিনি ফেলিসিয়াকে উপহার দিতেন। এসব অর্থ ফেরত দিতে হবে—এমন কোনো প্রত্যাশাও তখন তার আচরণে দেখা যায়নি।

Advertisements

বিচারকের মতে, প্রমাণ থেকে বোঝা যায়, আগরওয়াল ফেলিসিয়ার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন এবং সেই আবেগ থেকেই সম্পর্কের সময়ে তার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছিলেন। কিন্তু সম্পর্কটি তিক্তভাবে শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন সেই খরচগুলোর অর্থ ফেরত পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় তার মধ্যে।

আদালত আরও উল্লেখ করে, আগরওয়াল আর্থিকভাবে যথেষ্ট স্বচ্ছল ছিলেন এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রেও তার উদারতা ছিল। বিপরীতে ফেলিসিয়া তার মতো আর্থিক সামর্থ্যের অবস্থানে ছিলেন না। এমনকি বিভিন্ন খুদে বার্তায় ফেলিসিয়াকে আগরওয়ালের দামি উপহারের প্রস্তাবে বিস্মিত হতে দেখা যায়। কখনো কখনো তিনি এসব উপহার নিতে অনীহাও প্রকাশ করেছিলেন।

রায়ের শেষদিকে বিচারক ইংরেজ নাট্যকার উইলিয়াম কংগ্রিভের একটি বিখ্যাত পঙ্‌ক্তির উল্লেখ করেন—প্রেম যখন ঘৃণায় পরিণত হয়, তখন তার রোষ অত্যন্ত তীব্র হতে পারে। তবে বিচারক স্পষ্ট করে দেন, এমন আবেগ শুধু কোনো একটি লিঙ্গের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সিঙ্গাপুরে প্রেম, প্রত্যাখ্যান ও অর্থকে কেন্দ্র করে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনা অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০২৩ সালের শুরুতেও কে কাওশিগান নামের এক ব্যক্তি এক নারীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছিলেন। তার দাবি ছিল ৩০ লাখ সিঙ্গাপুর ডলারের বেশি। ওই নারী তার প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

কাওশিগানের অভিযোগ ছিল, প্রত্যাখ্যানের কারণে তিনি মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তার সুনামও ক্ষুণ্ন হয়েছে। তবে আদালত তার মামলা খারিজ করে দেন। পরে ওই নারীও পাল্টা মামলা করেন এবং কথিত হয়রানি থেকে নিজেকে রক্ষায় আইনি লড়াইয়ে যে অর্থ খরচ হয়েছে, তা ফেরত দাবি করেন। প্রেমের সম্পর্কে দেওয়া উপহার বা খরচ কখনো কখনো যে আবেগের স্মৃতি হয়ে থাকে, আবার সম্পর্কের পরিণতি বদলে গেলে সেই একই অর্থ যে আইনি বিরোধের কারণও হতে পারে—সিঙ্গাপুরের এই ঘটনাগুলো যেন তারই অদ্ভুত উদাহরণ।

Advertisements