নতুন জায়গায় ঘুমের সমস্যা কেন হয়, কী করবেন?

নিজের ঘর, পরিচিত বিছানা কিংবা প্রিয় বালিশ—এসবের বাইরে গেলেই অনেকের ঘুমের ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে কোথাও বেড়াতে গেলে প্রথম রাতটি যেন কাটতেই চায় না। নতুন বিছানা, ঘরের অচেনা গন্ধ, বাইরে থেকে আসা শব্দ কিংবা এয়ারকন্ডিশনারের একটানা আওয়াজ—সবকিছু মিলিয়ে ঘুমাতে বেশ বেগ পেতে হয়।
ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, অচেনা পরিবেশে প্রথম রাতে এমন অভিজ্ঞতা হওয়া মোটেও অস্বাভাবিক নয়। বরং এর সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক সতর্কতা এবং বিবর্তনগত অভিযোজনের সম্পর্ক রয়েছে। ঘুমবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় ‘ফার্স্ট-নাইট ইফেক্ট’।

নতুন জায়গায় গেলেই মস্তিষ্ক কেন সতর্ক হয়ে যায়?
সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ফ্রাইবার্গের ঘুম গবেষক আনা উইক মনে করেন, নতুন পরিবেশে প্রথম রাতের অস্বস্তি মানুষের একটি প্রাকৃতিক অভিযোজনের অংশ। পরিচিত পরিবেশে মস্তিষ্ক যখন নিরাপদ বোধ করে, তখন সহজে গভীর ঘুমে যেতে পারে। কিন্তু অচেনা জায়গায় গেলে মস্তিষ্ক পুরোপুরি শিথিল না হয়ে আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে কিছুটা সতর্ক থাকে।
এর পেছনে বিবর্তনগত কারণও রয়েছে। মানুষের পূর্বপুরুষদের জন্য অপরিচিত জায়গা সবসময় নিরাপদ ছিল না। ফলে নতুন কোনো স্থানে গিয়ে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক থাকার প্রবণতা মানুষের মস্তিষ্কে এখনো রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গের সাইকিয়াট্রি অধ্যাপক ও ঘুম গবেষক আহমেদ মায়েলিও বলেন, নতুন জায়গায় মানুষ গড়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিট কম ঘুমাতে পারে। এ সময় মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় থাকে। ফলে ঘুম এলেও মস্তিষ্ক পুরোপুরি গভীর বিশ্রামের অবস্থায় যেতে কিছুটা সময় নেয়।
বিষয়টি বোঝাতে তিনি ডলফিনের ঘুমের উদাহরণ দিয়েছেন। ডলফিন ঘুমানোর সময় মস্তিষ্কের এক অংশকে সক্রিয় রাখে, যাতে প্রয়োজনে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে নতুন পরিবেশে একই ধরনের আংশিক সতর্কতার প্রবণতা দেখা যেতে পারে।

এই প্রভাব শুধু তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিশু, কিশোর ও বয়স্কদের মধ্যে নতুন পরিবেশের কারণে ঘুমের এই পরিবর্তন তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে।
ভ্রমণে ঘুম নিয়ে কেন এত সমস্যা?
ভ্রমণের সময় ভালো ঘুম হওয়া শুধু আরামের বিষয় নয়, পুরো ভ্রমণ অভিজ্ঞতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। বোস্টনের ব্রিঘ্যাম অ্যান্ড উইমেনস হসপিটালের বিজ্ঞানী এবং হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ড. রেবেকা রবিন্সের মতে, পর্যাপ্ত ঘুম ভ্রমণকারীর সামগ্রিক সন্তুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০২০ সালে ‘ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় রবিন্স ও তার সহযোগীরা দেখতে পান, ভ্রমণের সময় মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ নিজেদের ঘুমের মান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন।
তাই নতুন জায়গায় যাওয়ার আগে শুধু দর্শনীয় স্থান বা যাতায়াতের পরিকল্পনা করলেই হবে না, ঘুমের পরিবেশ নিয়েও কিছুটা ভাবা প্রয়োজন।
ভ্রমণে ভালো ঘুমের জন্য যা করতে পারেন
পরিচিত কিছু জিনিস সঙ্গে রাখুন
নিজের বাড়ির পরিচিত পরিবেশ পুরোপুরি সঙ্গে নেওয়া সম্ভব নয়। তবে এমন কিছু জিনিস সঙ্গে রাখা যায়, যা মস্তিষ্ককে পরিচিত ও নিরাপদ অনুভূতি দিতে পারে।
ড. রেবেকা রবিন্সের পরামর্শ, নিজের পছন্দের সুগন্ধি, লোশন কিংবা পরিচিত কোনো সুবাস সঙ্গে রাখা যেতে পারে। ২০২৪ সালে ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ স্কুল অব মেডিসিন ও ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ মেডিকেল সেন্টারের গবেষণাতেও পরিচিত গন্ধের ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

শব্দের ক্ষেত্রেও একই কৌশল কাজে লাগতে পারে। হোটেলের আশপাশে শব্দ বেশি হলে হোয়াইট নয়েজ, বৃষ্টির শব্দ বা অন্য কোনো শান্ত পরিবেশের শব্দ শুনতে পারেন।
ঘুমের আগে দুশ্চিন্তা লিখে রাখুন
ভ্রমণের সময় অনেকের মাথায় ঘুরতে থাকে নানা চিন্তা—পরদিন কোথায় যেতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ ঠিকমতো হবে কি না, সময়মতো ঘুম থেকে উঠতে পারবেন কি না ইত্যাদি। এসব ভাবনা ঘুমের পথে বাধা তৈরি করতে পারে।
এক্ষেত্রে ঘুমানোর আগে একটি নোটবুকে নিজের চিন্তা বা উদ্বেগগুলো লিখে রাখার পরামর্শ দেন ড. রবিন্স। মনের কথাগুলো কাগজে লিখে রাখলে চিন্তার চাপ কিছুটা কমতে পারে এবং মনকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করা সহজ হয়।
বাড়ির রাতের রুটিন বজায় রাখুন
ভ্রমণে গিয়ে প্রতিদিনের ঘুমের অভ্যাস একেবারে বদলে ফেললে শরীর নতুন সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে আরও সমস্যায় পড়তে পারে। তাই বাড়িতে ঘুমানোর আগে যে রুটিন অনুসরণ করেন, সেটি যতটা সম্ভব বজায় রাখুন।
কুসুম গরম পানিতে গোসল, হালকা বই পড়া, মেডিটেশন, পছন্দের নাইট ক্রিম ব্যবহার কিংবা শান্ত কোনো কাজ—যেটি আপনার নিয়মিত অভ্যাস, সেটিই ভ্রমণের সময়ও করতে পারেন।
এসব পরিচিত কাজ মস্তিষ্ককে একটি সংকেত দিতে পারে যে এখন বিশ্রাম নেওয়ার সময়।
ঘুম না এলে বিছানায় পড়ে থাকবেন না
নতুন জায়গায় রাতের মাঝখানে ঘুম ভেঙে গেলে অনেকেই বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে থাকেন। এতে উল্টো মানসিক চাপ বাড়তে পারে।
ঘুম না এলে কিছু সময়ের জন্য বিছানা ছেড়ে হালকা আলোতে শান্ত কোনো কাজ করা যেতে পারে। ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার ব্যায়ামও করা যায়। যখন আবার ঘুমের অনুভূতি আসবে, তখন বিছানায় ফিরে যাওয়া ভালো।
এর ফলে মস্তিষ্কের কাছে বিছানা অস্থিরতা বা দুশ্চিন্তার জায়গা হিসেবে পরিচিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
হোটেল বাছাইয়েও নজর দিন
ভালো ঘুমের জন্য থাকার জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রমণের আগে এমন হোটেল বেছে নেওয়া ভালো, যেখানে শান্ত পরিবেশ, আরামদায়ক ম্যাট্রেস এবং আলো নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্ল্যাকআউট পর্দার ব্যবস্থা রয়েছে।
কগনিটিভ বিহেভিওরাল স্লিপ ডিজঅর্ডার বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানী লিডা স্ট্রসের পরামর্শ, ঘুমের সময় ঘর যতটা সম্ভব ঠান্ডা, অন্ধকার ও শান্ত রাখা উচিত।
নতুন বিছানায় শুয়ে কিছুটা সময় নিয়ে পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াও উপকারী হতে পারে। নিজের মনে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক অনুভূতির কথা ভাবলে অচেনা পরিবেশ নিয়ে অস্বস্তি কিছুটা কমতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকলে এক দিন আগে পৌঁছান
ভ্রমণের পরের দিন যদি গুরুত্বপূর্ণ কোনো সভা, পরীক্ষা, অনুষ্ঠান বা কাজ থাকে, তাহলে সম্ভব হলে গন্তব্যে এক দিন আগে পৌঁছানো ভালো।
অধ্যাপক আহমেদ মায়েলিওর মতে, এতে শরীর ও মস্তিষ্ক নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বাড়তি সময় পায়। ফলে প্রথম রাতের অস্বস্তি কিছুটা কাটিয়ে পরদিন তুলনামূলক সতেজ থাকা সম্ভব হতে পারে।
সব মিলিয়ে, অচেনা জায়গায় প্রথম রাতে ঘুমে সমস্যা হওয়া নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণ নেই। শরীর ও মস্তিষ্ককে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিলে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে। পরিচিত কিছু অভ্যাস সঙ্গে রাখা, ঘুমের পরিবেশ ঠিক রাখা এবং দুশ্চিন্তা কমানোর চেষ্টা করাই হতে পারে ভ্রমণে শান্তির ঘুমের সহজ উপায়।



