৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
বিনোদন

মুক্তির আগেই বিতর্কে আটকে যাওয়া ভারতের ১০ সিনেমা

39139E4B-D9A3-4724-A473-AAB58B2715A5

পর্দায় কী দেখানো যাবে আর কী যাবে না—সিনেমার ইতিহাসে এই বিতর্ক বহু পুরোনো। সময়ের সঙ্গে সমাজ, দর্শকের রুচি ও চলচ্চিত্রের ভাষা বদলালেও সিনেমাকে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে। কখনো যৌনতা ও নগ্নতার দৃশ্য, কখনো রাজনৈতিক বক্তব্য, আবার কখনো ধর্মীয় অনুভূতি, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে ভারতে সিনেমার মুক্তি আটকে গেছে।

ভারতে চলচ্চিত্রকে ছাড়পত্র দেয় কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড (সিবিএফসি)। তবে বিভিন্ন সময়ে সিনেমার ভাগ্য নির্ধারণে শুধু সার্টিফিকেশন বোর্ড নয়, সরকার, আদালত, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সামাজিক চাপও ভূমিকা রেখেছে। এমন অনেক সিনেমা রয়েছে, যেগুলো নিষিদ্ধ বা কার্যত আটকে যাওয়ার পর পরে মুক্তি পেয়েছে, আবার কিছু সিনেমা এখনো ভারতীয় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির মুখ দেখেনি।

আঁধি

গুলজার পরিচালিত ১৯৭৫ সালের সিনেমা ‘আঁধি’তে সুচিত্রা সেন ও সঞ্জীব কুমার অভিনয় করেন। সুচিত্রার চরিত্র আরতি দেবী ছিলেন একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রী। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অতীতের গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি মুক্তির পরই বিতর্কে জড়ায়।

অনেকের ধারণা ছিল, আরতি দেবীর চরিত্রটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আদলে নির্মিত। জরুরি অবস্থার সময় সিনেমাটির প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়। নির্মাতারা অবশ্য বরাবরই দাবি করেছিলেন, এটি ইন্দিরা গান্ধীর জীবনী নয়। জরুরি অবস্থার অবসান ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ১৯৭৭ সালে আবার সিনেমাটি মুক্তির সুযোগ পায়।

সিকিম

Advertisements

সত্যজিৎ রায়ের নির্মিত তথ্যচিত্র ‘সিকিম’ ১৯৭১ সালে তৎকালীন সিকিম রাজতন্ত্রের সময় তৈরি হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে সিকিম ভারতের অংশ হওয়ার পর সিনেমাটির রাজনৈতিক গুরুত্ব বদলে যায়।

তথ্যচিত্রটিতে সিকিমকে একটি স্বাধীন রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরায় এটি ভারতের জন্য সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় সিনেমাটি ভারতে কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। প্রায় চার দশক পর ২০১০ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় এবং সত্যজিৎ রায়ের এই কাজ আবার দর্শকের সামনে আসে।

ব্যান্ডিট কুইন

শেখর কাপুর পরিচালিত ‘ব্যান্ডিট কুইন’ নির্মিত হয় ডাকাত রানী হিসেবে পরিচিত ফুলন দেবীর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। নামভূমিকায় অভিনয় করেন সীমা বিশ্বাস।

১৯৯৪ সালে মুক্তির আগে থেকেই সিনেমাটি বিতর্ক তৈরি করে। ধর্ষণ, নির্যাতন ও নগ্নতার দৃশ্য সরাসরি দেখানোর পাশাপাশি ফুলন দেবীও সিনেমাটির বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। তাঁর দাবি ছিল, তাঁর জীবনের ঘটনা বিকৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং অনুমতি ছাড়াই ব্যক্তিগত জীবনের সংবেদনশীল বিষয় দেখানো হয়েছে।

আইনি জটিলতার কারণে একপর্যায়ে সিনেমাটির প্রদর্শন আটকে গেলেও পরে সেটি মুক্তি পায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসাও অর্জন করে সিনেমাটি।

কামসূত্র: আ টেল অব লাভ

মীরা নায়ার পরিচালিত ১৯৯৬ সালের ‘কামসূত্র: আ টেল অব লাভ’ প্রেম, কামনা, ঈর্ষা ও ক্ষমতার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নির্মিত। ছবিতে অভিনয় করেন নবীন অ্যান্ড্রুজ, সরিতা চৌধুরী, রেখা ও ইন্দিরা ভার্মা।

ভারতে মুক্তির আগে সিনেমাটির খোলামেলা যৌনদৃশ্য নিয়ে আপত্তি ওঠে। ফলে মুক্তির পথ কঠিন হয়ে পড়ে। পরে সম্পাদিত ও পরিবর্তিত সংস্করণের মাধ্যমে ভারতীয় দর্শকের কাছে সিনেমাটি পৌঁছানোর সুযোগ পায়।

আমু

সোনালি বোস পরিচালিত ‘আমু’ ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার পটভূমিতে নির্মিত। কঙ্কণা সেনশর্মা অভিনীত তরুণী চরিত্রটি নিজের অতীত ও পরিচয়ের সন্ধান করতে গিয়ে ওই দাঙ্গার ভয়াবহ ইতিহাসের মুখোমুখি হয়।

সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় সিনেমাটির প্রদর্শন নিয়ে আপত্তি ওঠে। টেলিভিশনে প্রচার নিয়েও তৈরি হয় জটিলতা। পরে কিছু দৃশ্য ও সংলাপে পরিবর্তন আনার পর সিনেমাটি মুক্তির অনুমতি পায়।

পাঁচ

অনুরাগ কাশ্যপ পরিচালিত ‘পাঁচ’ তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত সিনেমা। ক্রাইম ড্রামা ঘরানার এই ছবিতে সহিংসতা, মাদক, অপরাধ, অশালীন ভাষা ও যৌনতার উপস্থিতি ছিল।

এসব কারণে সিনেমাটি সার্টিফিকেশন পেতে দীর্ঘ জটিলতার মুখে পড়ে। বিভিন্ন সময়ে সিনেমাটি প্রদর্শিত ও আলোচিত হলেও ভারতীয় প্রেক্ষাগৃহে এর স্বাভাবিক মুক্তি আর হয়নি। ফলে ‘পাঁচ’ এখনো মুক্তি না পাওয়া আলোচিত ভারতীয় সিনেমাগুলোর একটি।

ইন্ডিয়াজ ডটার

২০১২ সালের দিল্লির গণধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে ব্রিটিশ নির্মাতা লেসলি উদউইন তৈরি করেন তথ্যচিত্র ‘ইন্ডিয়াজ ডটার’। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বিবিসিতে এটি প্রচারের কথা ছিল।

তথ্যচিত্রে মামলার এক দণ্ডিত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার ও নারীদের নিয়ে তাঁর মন্তব্য ঘিরে ভারতে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ভারত সরকার এর প্রদর্শন বন্ধের উদ্যোগ নেয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত হলেও ভারতে তথ্যচিত্রটি মুক্তি পায়নি।

দ্য পেইন্টেড হাউস

২০১৫ সালের মালয়ালম সিনেমা ‘দ্য পেইন্টেড হাউস’ পরিচালনা করেন সন্তোষ বাবুসেনান ও সতীশ বাবুসেনান। ছবিতে অভিনয় করেন নেহা মহাজন।

নারীর শরীর ও নগ্নতার দৃশ্য নিয়ে সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানায় এবং কয়েকটি দৃশ্য বাদ বা পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়। নির্মাতারা এতে রাজি না হওয়ায় ভারতে সিনেমাটির মুক্তি নিয়ে দীর্ঘ জটিলতা তৈরি হয়।

নীলম

তামিল সিনেমা ‘নীলম’ নির্মিত হয়েছিল শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ ও সেখানকার তামিল জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে। যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংঘাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয় তুলে ধরায় সিনেমাটি ভারতের সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় বাধার মুখে পড়ে।

সিনেমাটি মুক্তি পেলে ভারত-শ্রীলঙ্কা কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও সামনে আসে। ফলে সিনেমাটির ভাগ্য নির্ধারণে চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সন্তোষ

তালিকার সবচেয়ে সাম্প্রতিক আলোচিত সিনেমাগুলোর একটি ‘সন্তোষ’। ব্রিটিশ-ভারতীয় নির্মাতা সন্ধ্যা সুরি পরিচালিত সিনেমাটি ২০২৪ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয়। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন সাহানা গোস্বামী।

উত্তর ভারতের প্রেক্ষাপটে নির্মিত গল্পে স্বামীর মৃত্যুর পর এক তরুণীর পুলিশে যোগ দেওয়া এবং এক দলিত কিশোরীর হত্যার তদন্তের ঘটনা উঠে আসে। তদন্তের মধ্য দিয়ে পুলিশি সহিংসতা, জাতপাত, নারীবিদ্বেষ ও ইসলামবিদ্বেষের মতো সংবেদনশীল বিষয় সামনে আসে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা পেলেও ভারতে সিনেমাটির মুক্তি আটকে যায়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিবিএফসি বেশ কিছু কাটছাঁটের দাবি করেছিল। নির্মাতা সেই পরিবর্তনে রাজি না হওয়ায় ভারতীয় প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটির মুক্তি হয়নি। এমনকি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কারের জন্য যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিত্বও করেছিল ছবিটি।

এই সিনেমাগুলোর ইতিহাস দেখায়, একটি চলচ্চিত্রের মুক্তি শুধু নির্মাতা বা সার্টিফিকেশন বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক প্রতিক্রিয়া, আদালতের সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রীয় নীতি এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক—সবকিছুই কখনো কখনো পর্দায় একটি গল্প পৌঁছাবে কি না, তা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

Advertisements