৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

কুকুরের ঘ্রাণে ক্যানসার শনাক্ত, গবেষণায় যুক্ত এআই

images

মানুষের নিশ্বাসের ঘ্রাণ থেকেই ক্যানসারের মতো জটিল রোগ শনাক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে ভারতের বেঙ্গালুরুভিত্তিক একটি স্টার্টআপ। ‘ডগনোসিস’ নামের প্রতিষ্ঠানটি ক্লোয়ি নামের একটি কুকুরকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। কুকুরটির ঘ্রাণশক্তির সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে যুক্ত করে মানুষের শরীরে ক্যানসারের উপস্থিতি শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এই পদ্ধতিতে রোগীকে কুকুরের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে আসতে হবে না। বরং একজন ব্যক্তির নিশ্বাসের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। সেখানে কুকুরের ঘ্রাণ নেওয়ার পর তার মস্তিষ্কে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, এআইয়ের মাধ্যমে তা বিশ্লেষণ করে তথ্য হিসেবে রূপান্তর করা হবে।

কুকুরের ঘ্রাণশক্তি মানুষের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। বিভিন্ন গবেষণায় ইতিমধ্যে দেখা গেছে, প্রশিক্ষিত কুকুরের ঘ্রাণশক্তি ব্যবহার করে ক্যানসার, পারকিনসন রোগ, কোভিড-১৯সহ বিভিন্ন রোগ শনাক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই গবেষণা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ডগনোসিস নতুন এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেছে।

প্রতিষ্ঠানটি কুকুরের মাথায় থ্রিডি প্রিন্ট করা সেন্সরযুক্ত একটি বিশেষ হেলমেট ব্যবহার করছে। মানুষের নিশ্বাসের নমুনা শুঁকার সময় কুকুরের মস্তিষ্কে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, সেন্সরের মাধ্যমে তার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এসব প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য রোগের সংকেত শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ডগনোসিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ২৬ বছর বয়সী আকাশ কুলগোদ এএফপিকে বলেন, একটি কুকুর এক ঘণ্টায় কয়েক হাজারবার ঘ্রাণ নিতে পারে। প্রতিটি ঘ্রাণের মাধ্যমে একটি করে নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানটি আগামী বছর থেকে বাণিজ্যিকভাবে এই কার্যক্রম শুরু করার আশা করছে। তাদের দাবি, জার্মানি ও ইসরায়েলের দুটি প্রতিষ্ঠানের পর ডগনোসিস হবে এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা বিশ্বের তৃতীয় কোম্পানি।

প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী গবেষকেরা। তাদের মতে, ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব হলে রোগটির চিকিৎসা ও নিরাময়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হতে পারে। ভারতে অনেক রোগী ক্যানসারের পরীক্ষা করাতে আসেন রোগটি জটিল বা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর পর। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করার সহজ ও কার্যকর পদ্ধতি তৈরি হলে তা চিকিৎসাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Advertisements

ডগনোসিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা আকাশ কুলগোদ যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতে কগনিটিভ সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণায় যেসব কুকুর ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ল্যাব্রাডর জাতের মিশ্র প্রজাতির।

এই উদ্যোগে অ্যাক্সেল ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে প্রযুক্তিটি ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়ার লক্ষ্যে সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও গবেষণায় সহযোগিতা করা হচ্ছে।

কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?

গবেষকদের মতে, শরীরে কোনো রোগের উপস্থিতি তৈরি হলে শরীর থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থে পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে শরীরে এমন এক ধরনের স্বতন্ত্র গন্ধ তৈরি হতে পারে, যা মানুষের নাক দিয়ে শনাক্ত করা কঠিন হলেও কুকুরের ঘ্রাণশক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব।

মানুষের নাকে ঘ্রাণ শনাক্ত করার জন্য প্রায় ৫০ লাখ কোষ রয়েছে। বিপরীতে কুকুরের নাকে এ ধরনের কোষের সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি। ফলে মানুষের তুলনায় কুকুর অনেক বেশি সূক্ষ্ম ঘ্রাণ শনাক্ত করতে পারে।

ডগনোসিসের পরীক্ষার পদ্ধতিটিও তুলনামূলকভাবে সহজ। একজন ব্যক্তিকে প্রায় ১০ মিনিট একটি তুলার মাস্কে শ্বাস নিতে হয়। এরপর মাস্কটি একটি ব্যাগের মধ্যে সিল করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। সেখানে প্রশিক্ষিত কুকুর ওই নমুনার ঘ্রাণ নেয়। ফলে পরীক্ষার জন্য রোগীকে কুকুরের কাছে যেতে বা কুকুরের সঙ্গে কোনো ধরনের সরাসরি সংস্পর্শে আসতে হয় না।

ডগনোসিসের একটি গবেষণায় দেড় হাজারের বেশি মানুষের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের ছয়টি হাসপাতাল ওই গবেষণায় অংশ নেয়। গবেষণাটির ফল সম্প্রতি ‘জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’তে প্রকাশিত হয়েছে।

ডগনোসিসের দাবি, ওই পরীক্ষায় ক্যানসারের সাতটি প্রধান ধরন শনাক্ত করার ক্ষেত্রে প্রায় ৯০ শতাংশ নির্ভুল ফল পাওয়া গেছে। তবে এই ফলাফলকে আরও বৃহৎ পরিসরে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডগনোসিসের আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা ২৮ বছর বয়সী ইতামার বিটান। তিনি ইসরায়েলের একটি বিশেষ বাহিনীর ডগ ইউনিটে চার বছর কাজ করেছেন। তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কুকুরগুলোকে নমুনার ঘ্রাণ শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

বিটান জানান, কুকুরগুলোকে পুরস্কারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঘ্রাণ শনাক্ত করতে উৎসাহিত করা হয়। ‘স্নিফস্পেস’ নামের একটি কেন্দ্রে স্বয়ংক্রিয় ফিডারযুক্ত বিশেষ প্ল্যাটফর্মে কুকুরগুলো মানুষের নমুনা পরীক্ষা করে। কোনো নমুনার প্রতি প্রতিক্রিয়া জানাতে কুকুর স্থির হয়ে যেতে পারে অথবা উত্তেজিত হয়ে প্ল্যাটফর্মে আঁচড়াতে পারে। একই সময়ে একটি মেশিন কুকুরের এই প্রতিক্রিয়াগুলো পর্যবেক্ষণ করে এবং ধীরে ধীরে সেগুলো বিশ্লেষণ করতে শেখে।

তবে প্রযুক্তিটি নিয়ে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যেমন আশাবাদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিছু সংশয়ও। বেঙ্গালুরুর রামাইয়া মেমোরিয়াল হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান সন্তোষ কুমার দেবদাস বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক। তবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও বড় জনগোষ্ঠীর ওপর গবেষণা চালানো প্রয়োজন।

ম্যানিপাল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট অনকোলজিস্ট নীলেশ রেড্ডিও প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা নিয়ে সতর্ক অবস্থান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাস্তবে যেসব মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকরভাবে রোগ শনাক্ত করতে পারবে, তা সময়ের সঙ্গে আরও পরিষ্কার হবে।

ফলে কুকুরের অসাধারণ ঘ্রাণশক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে ক্যানসার শনাক্তের এই উদ্যোগ চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুললেও, বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের আগে আরও বড় পরিসরের গবেষণা ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই প্রয়োজন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Advertisements